Posted in খেয়াল করুন, জেনে রাখুন, দেশ ও জাতির প্রতি দ্বায়বদ্ধতা, ভালো লাগা, ভালোবাসা

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৩)


তারিখ: ১২ই-জানুয়ারী-২০১২ইং

অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে “উইন্ডোজ” অপারেটিং সিস্টেম কে আমি “খিড়কী” বা “জানালা” নামে ডাকতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। আমার এ লেখায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি লেখাটা পড়ে আহত হোন বা কষ্ট পেয়ে থাকেন তো সেইজন্যে আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। কিন্তু করার ও তো কিছু নেই। আমার লেখায় যদি আমিই শান্তি না পাই তো লিখবো কি করে‍‍? এই কাজটুকু করাই হতো না যদি না “প্রজন্ম ফোরাম” আর “উবুন্টু বাংলাদেশ” এর মেইলিং লিস্টে কিছু মানুষের ভুল ধারনা কে ভেঙ্গে দিতে কিছু কঠিন মন্তব্য না করতাম আর সেখানে আমাদের গৌতম দা আমাকে এই বিষয়ে বিশদভাবে লেখার জন্য উৎসাহ না দিতেন। গৌতম রয় কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার ভেতরের আমি কে টেনে-হেঁচড়ে বের করে নিয়ে আসবার জন্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটি আমি পর্ব আকারে বিগত ২৯শে ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী প্রতিটি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে প্রকাশ করছি এবং করবো ইনশাল্লাহ। আজ প্রকাশিত হলো তৃতীয় পর্ব। অষ্টম পর্বে লেখার উপসংহার প্রকাশ করার ইচ্ছে রয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব আপনার আগ্রহ থাকলে পড়ে নিতে পারেন।

শারীরিক অসুস্থতার কারনে আমার আজকের লেখাটুকুর মান খারাপ হতে পারে। পাঠকগণ নিজগুনে ক্ষমা করলে আগামীতে আরো কিছু লেখার ভরসা পাবো।

আজকের লেখায় আমি, ৩। একচেটিয়া ব্যবসার লক্ষ্যে অনৈতিক আচরন (Monopoly Behavior) বিষয়ে আলোকপাত করতে চেষ্টা করেছি।

দখল? বেদখল?? নাকি জবর দখল!!! পন্য ক্রয়-বিক্রয়ের বাজারে পৃথিবীর সব বিক্রেতাই চাইতে পারেন তাঁর পন্য ছড়িয়ে যাক, সবার নজর কাড়ুক আর সবাই সেই পন্যকে ভালোবেসে/পছন্দের সাথে/মানসম্পন্ন পন্য হিসেবে জেনে ব্যবহার করুক। এই ইচ্ছেটা অনৈতিক কোন কিছু নয়। কিন্তু যদি ইচ্ছেটা হয় এরকম যে, “আমার পন্য হবে বিশ্বের একমাত্র পন্য যা মানুষ বুঝে/না বুঝে, জেনে/না জেনে, গুনগত মান যাচাই না করেই ব্যবহার করবে এবং করতে বাধ্য হবে।” তাহলে এই চাওয়াটা কে আপনি কি বলবেন? নৈতিক, না অনৈতিক? আমার হিসেবে দ্বিতীয় ইচ্ছেটা সম্পূর্নই অনৈতিক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ।

কেন বললাম এমনটা? !!! যদি এখনো বিষয়টা নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার না হয়ে থাকে তো জেনে নিন সৃষ্টির আদি থেকে একজন মানুষের মৌলিক অধিকার গুলো কি কি? ১) খাদ্য, ২) পানি, ৩) পরিধেয় বা বস্ত্র, ৪) বাসস্থান, ৫) চিকিৎসা ও ৬) শিক্ষা। এই অধিকারগুলোর প্রতিটার সাথে জড়িয়ে রয়েছে একজন মানুষের অস্তিত্ব, সমগ্র মানবজাতির ভূত-ভবিষ্যৎ। আপনি হয়তোবা আমার কথার আগামাথা এখনো অবদি ঠিক বুঝে উঠতে পারেন নাই। একটু কষ্ট করে পড়তে থাকুন, বুঝে যাবেন। মানুষের এই অধিকার গুলো রহিত করে দেয়া সম্ভব যদি তাঁকে বিরত রাখা সম্ভব হয় এমন একটি জ্ঞান বা বোধ থেকে যে, “আসলে তাঁর প্রাপ্য কতটুকু?”

মাইক্রোসফট ঠিক এমনটাই অতীত সময়ে সাধারন কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের সাথে করেছে, এখনো করছে, আগামীতে আরো ভয়ংকররূপে আরো ভয়াবহ কিছু করতে চাইছে।

কিভাবে সম্ভব? সব পাবলিকরে কি বলদ পাইছে??? যত্তসব ফালতু . . . !!! আমি মোটামুটি নিশ্চিত আমার আজকের লেখার উপরের দুটো অনুচ্ছেদ পড়ে এই অবদি আসার সময়ে আপনার মনের প্রতিক্রিয়া এই অনুচ্ছেদের শুরুর বাক্যটার মতোই। তবে এখন যে প্রমাণগুলো আপনার সামনে পেশ করবো একটার পর একটা তাতে করে লেখাটা পড়ে শেষ করার পর যদি নিজেকে এর চাইতেও খারাপ পর্যায়ের কোন প্রানী কিংবা অনুজীব বলে মনে হয় আর প্রতিক্রিয়ায় হাতের কাছে যা পান তা ছুঁড়ে মারার অভ্যাস যদি থেকে থাকে তো সাবধান হোন। পারলে লেখার পরবর্তী অংশে একটা করে অনুচ্ছেদ পড়বেন আর তারপর পড়া বন্ধ করে উঠে গিয়ে পানি খেয়ে আসবেন। তারপর কিছুক্ষন নিজেকে শান্ত করে নেবেন এবং পরবর্তী অংশ পড়বেন।

ভাবুন দেখি? এই অংশে কতগুলো প্রশ্ন থাকছে কম্পিউটার জীবনের সর্বপ্রথমে গ্রাফিক্যাল অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে “উইন্ডোজ” বা “খিড়কী” ব্যবহারকারী আমজনতার জন্য। আসুন, দেখে নিই এই “আমজনতা” নিজেরা কতটুকু সচেতন?
১. আপনার ব্যবহৃত প্রথম ওয়েব ব্রাউজার কোনটি? এটা কি “খিড়কী”র সাথেই দেয়া ছিলো?
২. বর্তমানে আপনি কোন ব্রাউজার ব্যবহার করেন? কেন?
৩. বর্তমানের ব্যবহৃত ব্রাউজারটার বিষয়ে আপনি কিভাবে জানতে পেরেছেন?
৪. আপনার ব্যবহৃত প্রথম অফিস প্যাকেজ কোনটি? এটা কি বিনামূল্যের ছিলো?
৫. বর্তমানে আপনার ব্যবহৃত অফিস প্যাকেজ কোনটি? এটা কি আপনার নিজের ইচ্ছেয় আপনার কম্পিউটারে ইন্সটল করেছেন? নাকি কর্মক্ষেত্রের অন্য সবার সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্যই কাজটা করা?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে আমার লেখার অধিকাংশ পাঠকের ভাবনায় যেগুলো আসবে তা আমি নিচে উত্তরমালা হিসেবে দিয়ে দিলাম। মিলিয়ে নিন। 🙂
উত্তর ১. ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার। হুমম! দেয়া ছিলো। ডেস্কটপেই তো শর্টকার্ট/লিংক দেয়া ছিলো।
উত্তর ২. অপেরা/ফায়ারফক্স। গতি এবং নিরাপত্তা। অনেক আনওয়ান্টেড পপ-আপ আর অ্যাড থেকে বেঁচে নিজের কাজটুকু শান্তিমতো করে নিতে পারি।
উত্তর ৩. আমার এক পরিচিত জানিয়েছিলেন। উনি নিজের ব্যবহার অভিজ্ঞতায় আমাকে এই বিষয়ে উৎসাহিত করেছিলেন।
উত্তর ৪. মাইক্রোসফট অফিস ৯৭/২০০০/এক্সপি/২০০৭/২০১০। না এটা বিনামূল্যের ছিলো না। আমি ৪০/৫০/৬০ টাকায় ডিভিডিতে কম্পিউটার দোকান থেকে কিনেছিলাম/কম্পিউটারের দোকান থেকেই কম্পিউটারটা ক্রয় করার সময় দিয়ে দিয়েছিলো।
উত্তর ৫. মাইক্রোসফট অফিস ২০১০। ভূতে কিলায় নাকি??? যে শখ করে একটা প্যাকেজের শেখা কাজের হাতের দক্ষতাটুকু নষ্ট করে নতুন প্যাকেজে আপগ্রেড করবো? ঠেলায় পড়লে বাঘেও ঘাস খায়, আর আমি তো . . .

এবারে পড়া বন্ধ করুন এবং মনিটরের সামনে থেকে উঠে যান। আমি বুঝতে পারছি আপনার কপালে চিকন ঘাম দেখা দিয়েছে এবং আপনি মোটামুটি দুই চোখের ভুরু কপাল কুঁচকে এক করে ফেলেছেন। কোন একটা অজানা আশংকা আপনার মনে দানা বাঁধছে এবং আপনি লেখার এই পর্যায়ে এসে হুট করেই আমার এই সিরিজের ১ম পর্ব এবং ২য় পর্বের লিংক হাতড়াচ্ছেন। চিন্তার কোন কারন নাই লিংক এই লেখার একেবারে শেষে পেয়ে যাবেন। তবে আপাতত নিজেকে শান্ত করুন। (দশ মিনিটের বিরতি) . . .

আসুন এবারে একটু অন্যরকমের কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হই —
১. আপনি কি কখনো ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার কে সিস্টেম থেকে আনইন্সটল/রিমুভ করেছেন? করতে চেষ্টা করেছেন?
২. উদ্যোগে পূর্নাঙ্গরূপে সফল হয়েছেন?
৩. বর্তমান এমএসঅফিস ২০১০ এর পূর্বনির্ধারিত আদর্শমানে সৃষ্টি করা যে কোন কাজ/নথি পূর্বের অফিস এক্সপি/ অফিস ২০০০ এ নিয়ে পড়া কিংবা কোন কাজ করতে পেরেছেন?

উত্তরমালাঃ (আপনার ধারনার সাথে মিলে গেলে তা সম্পূর্ন বকতালীয় :D)
উত্তর ১. হুমম!! চেষ্টা করেছিলাম। মোটামুটি সিস্টেমটা বেশ দ্রুতগতির হয় এতে।
উত্তর ২. আরে ধুর! তা হয় নাকি? পুরোপুরি মুছে যায় দেখায়। কিন্তু যদি কখনো Adress Bar এ কোন রকমের ওয়েব এড্রেস লেখা হয়ে যায় তো দুম করেই ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার চালু করার চেষ্টা করতে থাকে।
উত্তর ৩. দিলেন তো দিলে দাগা!!! এই ঝামেলার জন্যেই তো এই নতুন অফিস প্যাকেজের ব্যবহার করতে হচ্ছে। বাইরের থেকে কতোজনে মেইলে ডকুমেন্ট পাঠায় নতুন এডিশনে আমি পুরোনোটা ব্যবহার করি বলে গালমন্দ শুনতে হয়। তাই কষ্ট করে হলেও এখন নতুনটাতেই থাকতে হচ্ছে।

এই ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার সহ আরো কিছু কুটমতলব আর ব্যবসায়িক ধান্দাবাজির কারনেই মাইক্রোসফটকে ১৯৯৮ সালে এন্টিট্রাস্ট বা অধিকার সংরক্ষন মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছিলো। তবে মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রতিষ্ঠান অর্থ আর পেশী শক্তির বলে এই মামলার রায়কে অনেকটাই অমান্য করে চলেছে আজো। এই মামলার কাজ চলার সময়েই মাইক্রোসফট দুটো ভিডিও উপস্থাপন করে আদালতে যাঁর একটার মধ্যে প্রমাণের চেষ্টা ছিলো এই যে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ব্রাউজার ব্যতীত এই বিখ্যাত “খিড়কী” সিস্টেম স্লো হয়ে পড়ে। আর অপরটিতে দেখানো হয়েছিলো যে কতো সহজে আমেরিকা অনলাইন বা এওএল ব্যবহারকারীরা নেটস্কেপ নেভিগেটর “খিড়কী” সিস্টেমে ইন্সটল করা যায়। মজার বিষয় হলো আদালতে উপস্থাপিত তথ্যচিত্রের দুটোই বানোয়াট প্রমাণিত হয় এবং মাইক্রোসফট আদলতকে ফাঁকি দেবার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়।

এটা অত্যন্ত সহজ বিষয় যে মাইক্রোসফটের একটা অপারেটিং সিস্টেম যেটার প্রতিটা সংস্করন বাজারজাত করনের আগে সে এমনভাবে বিপনন ও বিজ্ঞাপন ছড়ায় যে এটার চাইতে শক্তিশালী আর কোন অপারেটিং সিস্টেম ডেক্সটপের দুনিয়ায় হতেই পারেনা তা কিনা একটা ওয়েব ব্রাউজারের কারনেই সমস্যাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। আর নেটস্কেপ নেভিগেটর তো তৎকালীন সময়ে “খিড়কী” তে ইন্সটল করা ছিলো বিশাল একটা জটিল প্রক্রিয়া যা কিনা মাইক্রোসফট সেই তথ্যচিত্রে ছেঁটে বাদ দিয়ে তারপর উপস্থাপন করেছিলো। মজার বিষয় হলো আদালত এই দুইটা বিষয়ই আদালতের কম্পিউটারে নিরীক্ষা করে দেখতে এবং প্রমাণ করতে বলেন মাইক্রোসফটের দুইজন ভাইস প্রেসিডেন্ট পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে। এবং তাঁরাই কাজগুলো করতে ব্যর্থ হন ও স্বীকার করে নেন যে মাইক্রোসফট এ বিষয়ে প্রতারনার আশ্রয় নিয়েছে।

ফলাফলে আপনি এতদিন ধরে যে চটকদার বিজ্ঞাপনের মোহে মোহাবিষ্ট হয়ে/না জেনে-বুঝেই আবর্জনা আর ছাইপাশ গিলছিলেন, গিলেছেন, গিলছেন এবং গিলবেন তা তো নিশ্চয়ই পরিষ্কার বুঝে উঠতে পারছেন।

এছাড়া এই মামলায় মাইক্রোসফট সবচাইতে বড় যে ধাক্কাটা খায় তা ছিলো “গোপন ও অনৈতিক ব্যবসায়িক চুক্তিতে বাধা”, যা মাইক্রোসফট ইন্টেল, এইচপি, ডেল এইরকম নামীদামী প্রতিষ্ঠানের সাথে করতো। কি থাকতো এইসব চুক্তিতে? এই চুক্তিগুলোর মূল উদ্দেশ্যই থাকতো হার্ডওয়্যার ভেন্ডরদেরকে বাধ্য করা যেনো তাঁরা মাইক্রোসফট বাদে আর অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সফটওয়্যার/হার্ডওয়্যার ড্রাইভারের বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হতে না পারে। এছাড়াও উইন্ডোজের ওইএম এডিশন প্রিইন্সটলড অবস্থায় এই সব নির্মাতার পিসি/ল্যাপটপ/নেটবুক গুলোতে দিতে বাধ্য করা যাঁর মাধ্যমে মাইক্রোসফটের পরবর্তী প্রজন্মের ক্রেতা সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশে সফটওয়্যার পাইরেসী আর অসচেতন ব্যবহারকারীর বদৌলতে অবশ্য এইসব চুক্তি না করেও প্রচুর পরিমানে স্বয়ংক্রিয় বিপনন আর বিজ্ঞাপন পেয়ে গিয়েছে, পাচ্ছে আর পাবে। আরো বিস্তারিত জানতে পড়ে নিতে পারেন — http://en.wikipedia.org/wiki/United_States_v._Microsoft

আসুন এবারে অফিস প্যাকেজের বিষয়টাতে। এখানে তো আপনি নিজেই ভুক্তভোগী। বুঝতেই পারছেন মাইক্রোসফট কিভাবে বাধ্য করতে পারে একজন ব্যবহারকারীকে নিজের পছন্দের সফটওয়্যার ব্যবহার ছেড়ে নতুন আসা পন্যের ব্যবহারে। একবার ভাবুন তো যদি এটা আপনি বাজারে ৬০টাকা ঐ ডিভিডিটাতে কিনতে না পেতেন কিংবা আপনার প্রতিষ্ঠান লাইন্সেসিং করতে দেরী করতো তো আপনার কাজের কি দশা হতো? আর যদি এমন হতো যে আপনি আপনার নিজের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স করবেন সফটওয়্যারগুলোর তো তাতে বছর পাঁচেকের মধ্যে কি ঘটবে? খেয়াল করে দেখেন মাইক্রোসফট একটা পন্য থেকে নতুন একটা পন্যে আপগ্রেড করতে দেয় ঠিকই তবে লাইসেন্সিংয়ে কিন্তু পুরোনো ব্যবহারকারী হিসেবে আপনাকে কোন ছাড় দেয় না। বরংচ নতুন পন্য হিসেবে দামটা কমই দিচ্ছেন এই হিসেব দেখিয়ে যে পয়সাটুকু কেটে নেয় তাতে আপনি নতুন আসার সফটওয়্যারের প্যাকেজটা আপগ্রেড না করে নতুন লাইসেন্স করেই নিতে পারতেন।

শুধু ব্রাউজার কিংবা অফিস প্যাকেজই নয়। মাইক্রোসফট এগুলো ছাড়াও আরো কিছু অপরাধ করে থাকে যাকে “মনোপলি” বলা চলে। যেমন —
১. নির্দিষ্ট কিছু হার্ডওয়্যার ব্যতীত তাঁর কোন সাপোর্ট পাবেন না বলে একপ্রকারে প্রযুক্তিপন্যের ক্রেতাকে বাধ্য করা হয় মাইক্রোসফট অনুমোদিত প্রস্তুতকারকের পন্যটাই কিনতে।
২. মাইক্রোসফটের প্রতিটা নতুন অপারেটিং সিস্টেম/অফিস প্যাকেজ রিলিজের সাথে সাথে হার্ডওয়্যার রিকয়ারমেন্টস এতটাই বদলে ফেলা হয় যে নতুন হার্ডওয়্যার কিনতে ব্যবহারকারী বাধ্য হন।
৩. নিজের পন্য/সফটওয়্যার ব্যতীত ব্যবহারকারীর পছন্দের সফটওয়্যার “জানালা” সিস্টেমে ধীরে ধীরে ধীরগতির করে দেয়া হয়/কখনো কখনো প্রোগ্রাম রান করার সময় হুট করেই ক্রাশ করে যায়। যেনো ব্যবহারকারীর মনে ঐ ব্যবহারকারীর মনে বিরূপ ধারনার জন্ম নেয়।
৪. নিজের অপারেটিং সিস্টেমের ত্রুটি আড়াল করে মাইক্রোসফটের “জানালা” সিস্টেম কখনো কখনো অন্য কোন সুখ্যাত সফটওয়্যার নির্মাতার পন্যকেও “ম্যালিশাস” হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ইন্সটল ও ব্যবহারে বাধা দেয়। কখনো কখনো ঐ সফটওয়্যার অতিপ্রয়োজনীয় হলে “জানালা” সিস্টেমের নিরাপত্তা/ফায়ারওয়াল ব্যবস্থাকে বন্ধ করে কাজ করতে বাধ্য হতে হয়। এই ধরনের জটিল প্রক্রিয়ায় কাজ করতে অনেক সাধারন ব্যবহারকারীই অস্বস্তিবোধ করেন এবং যন্ত্রনা এড়াতে মাইক্রোসফট পন্যই ব্যবহার করতে উদ্যোগী হন।
৫. কোন সফটওয়্যার হুট করে কাজ বন্ধ করে দিলে কিংবা সিস্টেমের কোন কাজ আটকে গেলে তা ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রনের বাইরে রাখা হয় এবং এই বিষয়টা নিয়ে মাইক্রোসফটকে রিপোর্ট করা ছাড়া আর কোন উপায়ই রাখা হয়নি। ফলে অফিসিয়াল সাপোর্ট একমাত্র মাইক্রোসফট স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি ছাড়া পাওয়া সম্ভব না। একই সাথে এই অবস্থায় বিকল্প কোন সফটওয়্যারের ব্যবহারে কাজটুকু করে নেয়া সম্ভব হবে সেটার কোন নির্দেশনা/তথ্য অপারেটিং সিস্টেমের ভেতরের সহায়িকাগুলোয় পাওয়া অসম্ভব। মানে জ্ঞানের বিকাশে বাধা সৃষ্টির সর্বোত্তম প্রচেষ্টা।

সবচাইতে বিরক্তিকর বিষয়টা যা এ অবদি আমি নিজে মাইক্রোসফটের প্রতিটা লাইসেন্সিং নথি পরীক্ষা করে পেয়েছি সেই মতে —
মাইক্রোসফটের প্রতিটা সফটওয়্যারই গ্যারান্টি/ওয়ারেন্টি/তথ্যের ক্ষতিতে ক্ষতিপূরনে অস্বীকার করে। তাহলে ব্যবহারকারী কি সম্পূর্ন নিজ দ্বায়িত্বে এই পন্যের ব্যবহার করবে? যদি তাই হয় তো এত বিশাল মূল্যমানের বিদেশী অর্থের বিনিময়ে কেনা পন্যের ব্যবহারকারীর স্বার্থ বা ক্রেতাস্বার্থ সুরক্ষিত হলো কোথায়? এটা কি খাবার দিয়ে পানি না দেবার মতো কাজ না? এটা কি ছাদ ছাড়া দালানে থাকতে দেবার মতো ব্যবস্থা নয়? এটা কি ডাক্তার ছাড়া সুচিকিৎসার নিশ্চয়তা দেয়ার মতো ফাজলামো না? এটা কি শিক্ষার নামে কুশিক্ষা নয়?

আশা করি এবারে নিজেকেই নিজে বলতে ও বোঝাতে পারবেন যে মাইক্রোসফটের এহেন কাজকর্ম কি ব্যবসা? নাকি জোর-জবরদস্তি করে লুট করা?

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৪) প্রকাশিত হবে আগামী ১৯শে জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ১) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ২৯শে ডিসেম্বর ২০১১ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ২) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ৫ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।

Posted in খেয়াল করুন, জেনে রাখুন, দেশ ও জাতির প্রতি দ্বায়বদ্ধতা, ভালো লাগা, ভালোবাসা

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ২)


তারিখ: ৫ই-জানুয়ারী-২০১২ইং

ভূমিকার পূর্বেঃ “উইন্ডোজ” অপারেটিং সিস্টেম কে আমি “খিড়কী” বা “জানালা” নামে ডাকতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। আমার এ লেখায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি লেখাটা পড়ে আহত হোন বা কষ্ট পেয়ে থাকেন তো সেইজন্যে আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। কিন্তু করার ও তো কিছু নেই। আমার লেখায় যদি আমিই শান্তি না পাই তো লিখবো কি করে‍‍? এই কাজটুকু করাই হতো না যদি না “প্রজন্ম ফোরাম” আর “উবুন্টু বাংলাদেশ” এর মেইলিং লিস্টে কিছু মানুষের ভুল ধারনা কে ভেঙ্গে দিতে কিছু কঠিন মন্তব্য না করতাম আর সেখানে আমাদের গৌতম দা আমাকে এই বিষয়ে বিশদভাবে লেখার জন্য উৎসাহ না দিতেন। গৌতম রয় কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার ভেতরের আমি কে টেনে-হেঁচড়ে বের করে নিয়ে আসবার জন্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটি আমি পর্ব আকারে বিগত ২৯শে ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী প্রতিটি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে প্রকাশ করছি এবং করবো ইনশাল্লাহ। আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় পর্ব। অষ্টম পর্বে লেখার উপসংহার প্রকাশ করার ইচ্ছে রয়েছে। প্রথম পর্বটিও আপনি পড়ে নিতে পারেন।

আজকের লেখায় আমি, ২। ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তায় অযাচিত হস্তক্ষেপ (Invading Privacy) বিষয়ে আলোকপাত করতে চেষ্টা করেছি।

আপনার কম্পিউটারকে বিভিন্ন কাজের নির্দেশনা কি আপনিই দিচ্ছেন? নাকি ! ? ! হুট করে কথাটা বলতেই আপনার মাথার ভেতরটা গুলিয়ে গেলো, তাই না? আসলে এই বিষয়টা নিয়ে আপনারই মতো আরো অনেকেই অনেক রকমের চিন্তা ভাবনা করে থাকেন। তবে সব ভাবনার কেন্দ্র কিন্তু একটি মাত্র বিন্দুতে এসেই মিলিত হবে। আর তা হলো আপনার ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বা সুরক্ষা। এমনকি এই বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে ভাববার পর আপনি কখনো কখনো এটাও চিন্তা করে থাকেন যে, আপনার কম্পিউটার শুধুমাত্র (একমাত্র বললে বিষয়টা পরিপূর্নতা পায়) আপনারই নির্দেশনা নেবে, এমনকি আপনার অতি প্রিয় মানুষটির নির্দেশনাও যেনো সে অমান্য/অগ্রাহ্য করে যায়। তো আপনার এই চিন্তা/আস্থার জায়গাটুকুকে দখল করতেই আসলে বিশ্বাসযোগ্য/আস্থাপূর্ন কম্পিউটিং এর ধারনাটা এসেছে। আরো বিস্তারিত তথ্য পাবেন উইকিপিডিয়ার এই পৃষ্ঠাতে — http://en.wikipedia.org/wiki/Trusted_Computing।

কিভাবে করা হচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তায় অযাচিত হস্তক্ষেপ? খেয়াল করে দেখুন আমি ঠিক আগের অনুচ্ছেদেই আপনার চিন্তা দখল হয়ে যাবার কথা বলেছি। তখন এই বিষয়টাকে হালকা করে নিলেও এই অনুচ্ছেদটুকু পড়ার পর হয়তোবা আপনার নিজেরই চোখ নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য হয়ে উঠবে। হয়তোবা আপনি এও চিন্তা করতে শুরু করবেন যে, তাহলে কি আপনি এতদিন নিজ গৃহে (কম্পিউটারে) দুধ-কলা দিয়ে সাপ পুষেছেন? ঐ যে আপনার বিশ্বাস কিংবা ভাবনার জায়গাটুকু যেখানে আপনি নিজের বাইরে আর কাউকেই আপনার কম্পিউটারে কোন রকম হস্তক্ষেপ করায় কিংবা করতে দিতে অনাগ্রহী ঠিক সেইটাকেই পুঁজি করে মাইক্রোসফট তৈরী করেছে বিশেষ একটা ব্যবস্থা, যার মনভোলানো নাম দিয়েছে — “আসল খিড়কীর মজা” বা Windows Genuine Advantage.

আসুন দেখি, কি এই “আসল খিড়কীর মজা” এটা মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ এক্সপি সিস্টেমের সাথে থাকা এমন একটি প্রযুক্তি যাঁর মাধ্যমে মাইক্রোসফট নিজের সার্ভার থেকে আপনার কম্পিউটারের বিভিন্ন হার্ডওয়্যারকে এক্সেস বা পরিচালনা করতে পারে। ভয়াবহ বিষয়টা হলো এই যে মাইক্রোসফট আপনার পিসিতে সবচাইতে বেশী যে যন্ত্রাংশটুকুর উপরে কর্তৃত্ব দখল করে নেয় সেটা হলো আপনার হার্ডডিস্ক। এই Windows Genuine Advantage (আসল খিড়কীর মজা) এর আসল মজাটা এখানেই যে, সে প্রাথমিকভাবে আপনার কাছ থেকেই বিভিন্ন চুক্তি/শর্তের মাধ্যমে আপনার হার্ডডিস্কের যত্রতত্র তথ্যানুসন্ধানের অনুমতিটুকু হাসিল করে নেয় এই বলে যে, “এটার মাধ্যমে সে আসলে আপনার কম্পিউটারের ভেতরে যে আসলেই একটি লাইসেন্সকৃত “জানালা” বা “খিড়কী” ওএস ব্যবহৃত হচ্ছে তা নিশ্চিত করা সহজতর হয়”। কিন্তু ষড়যন্ত্রমূলক বিষয়টাই এখানে যে, এই প্রাথমিক অনুমতিটুকু নেবার পরপরই আসলে মাইক্রোসফট দূরনিয়ন্ত্রিত সার্ভার থেকেই আপনার কম্পিউটারের পরিপূর্ন নিয়ন্ত্রন ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যায়। প্রতিফলনে যদি এমন কোন হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যার সে আপনার কম্পিউটারে পায়, যা কিনা মাইক্রোসফটের অনুমোদিত নয় কিংবা এই Windows Genuine Advantage এর নিয়ন্ত্রনের বাইরে তো সেক্ষেত্রে সে আপনার কম্পিউটারের কার্যকারীতা রহিত করার মতো ক্ষমতা রাখে।

এক্সপি’র ক্ষেত্রে এই http://www.microsoft.com /genuine/downloads/faq.aspx পৃষ্ঠার মাধ্যমে জানা যায় যে, মাইক্রোসফট যে সব তথ্যের ভিত্তিতে এই Windows Genuine Advantage বা WGA Checks সম্পন্ন করে থাকে তা হলো —
০১। কম্পিউটারটির নাম এবং মডেল
০২। বায়োস বা বেসিক ইনপুট আউটপুট সিস্টেম
০৩। MAC বা ম্যাক অ্যাড্রেস
০৪। Globally Unique Identifier বা GUID বা আপনার কম্পিউটারে প্রদত্ত এমন একটি সংখ্যা যা কিনা একমাত্র আপনার এই পিসির বর্তমান হার্ডওয়্যার কনফিগারেশনেই প্রযোজ্য হবে।
০৫। হার্ডডিস্কের ক্রমিক নম্বর
০৬। ভৌগলিক অবস্থান ও ভাষা সংক্রান্ত অপারেটিং সিস্টেমের সেটিংসসমূহ
০৭। অপারেটিং সিস্টেমটির সংস্করন
০৮। কম্পিউটারটির বায়োসের তথ্য (প্রস্তুতকারক, সংস্করন, প্রস্তুতকাল/তারিখ)
০৯। কম্পিউটারটির প্রস্তুতকারকের তথ্য
১০। ব্যবহারকারীর আঞ্চলিকতা সংক্রান্ত তথ্যাদি
১১। মেয়াদ যাচাইয়ের তথ্য এবং ইন্সটলেশন সংক্রান্ত তথ্যাদি
১২। খিড়কী অথবা মাইক্রোসফট অফিস প্যাকেজে’র পন্যযাচাইকরণ গোপন শব্দচাবি/ সংখ্যা
১৩। “খিড়কী”এক্সপি’র পন্যপরিচয়ের তথ্যাদি

এমন সব অভিযোগ রয়েছে এই WGA প্রযুক্তি নিয়ে যা শুনলে আপনি হয়তো বা সেই দুধ-কলা-সাপ সুত্রের বাস্তব প্রয়োগ জগতে চলে আসবেন। যেমন — এটি ব্যবহারকারীর বিনা অনুমতিতে কম্পিউটারে থাকা সফটওয়্যার বা গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র বেমালুম গায়েব করে দেয় (সংক্ষেপে বললে মুছে ফেলে)। এটা ব্যবহারকারীর কাছ থেকে সেই প্রাথমিক অনুমতিটুকু নিয়ে নেবার পর পরবর্তীতে আর কোন অনুমোদন ছাড়াই ‘খিড়কী’র সাথে নিজেকেই নিজে সাম্প্রতিকীকরন (আপডেট) করে থাকে এবং ব্যবহারকারীদেরকে খুব কম বেছে নেবার সুযোগ দেয় এই বিষয়ে যে, “কিভাবে মাইক্রোসফট এই সিস্টেমকে মনিটর করবে/করবে না।” অনেকে ব্যবহাকারীরই অভিযোগ যে, মাইক্রোসফটের এই WGA প্রযুক্তিটি আসলে একটি “নজরদারী প্রযুক্তি”, যদিও বা মাইক্রোসফট এই অভিযোগ অস্বীকার করে থাকে এবং সেই সাথে নিজেই এই প্রযুক্তি বিষয়ে সিদ্ধান্তসমূহ নেবার এবং তা জোরপূর্বক হলেও বাস্তবায়নের ক্ষমতাটুকু সংরক্ষন করে। এই কর্মকান্ডের মাধ্যমেই মাইক্রোসফট প্রমাণ করে দেয় যে, আসলেই এই প্রযুক্তিটি “ব্যক্তিতথ্য সুরক্ষা/নিরাপত্তা”র প্রতি মারাত্মক রকমের হুমকি। আরো জানতে পড়তে পারেন — http://en.wikipedia.org/wiki/Windows_Genuine_Advantage

উপরের লেখাটুকু পডতে পড়তে হয়তো বর্তমান সময়ের “খিড়কী” বা “জানালা” ওএস ব্যবহারকারীদের বুকের ভেতরে বাতাস আকুপাকু করা শুরু করেছিলো। তবে লেখাটুকুর শেষ লাইনটা পড়ার পর একটানে আটকে থাকা বাতাস বুক থেকে ঝেড়ে ফেলেছেন। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে মনের আনন্দে জপতে শুরু করে দিয়েছেন — “যাক বাবা আমি তো এখন আর ‘খিড়কী এক্সপি’ চালাচ্ছি না। আমি ‘সপ্তম জানালা’য় চলে এসেছি।” হয়তোবা সত্যজিৎ রায় এর সেই “গুপী গাইন বাঘা বাইন” চলচ্চিত্রের গুপী ও বাঘার ন্যায় মনের মধ্যেও ঢোল বাজছে আর সুর ভজে যাচ্ছে — “তাক ধিন্ ধিন্ না ধিন্ তা, নাইকো মোদের চিন্তা”। তো সেই আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা, ধিতাং ধিতাং বোলে নৃত্যানন্দে মেতে চলা মনের অধিকারীদের জন্য সুখবর — “সপ্তম জানালা’র” ক্ষেত্রে মাইক্রোসফট প্রযুক্তিটির কার্যকারীতায় আপনার জন্য কোনরূপ ইতিবাচক পরিবর্তন না এনে শুধুমাত্র নামটাকে বদলে দিয়েছে। এখন থেকে এটাকে আপনারা (হাড়ে হাড়ে) চিনবেন Windows 7 Activation Technologies বা WAT বা “সপ্তম জানালা সক্রিয়করন প্রযুক্তি” নামে। 🙂

আপনার পিসির পরিচালনা পদ্ধতিতে “সপ্তম জানালা” যুগান্তকারী কোন পরিবর্তন সাধন করুক চাই না করুক ইতোমধ্যে আপনার হৃদযন্ত্রের জানালা গুলো যে দুমদাম খুলছে আর কপাটে কপাটে ঝড়ের দাপটে বাড়ি খাচ্ছে সে আমি বিলক্ষন দেখতে পাচ্ছি। বুকের ধুকপুকানিটুকু কমে আসলে তবেই এই লেখার পরবর্তী অংশটুকু পড়ুন। তা না হলে দুম করে নিজের হৃদযন্ত্র কিংবা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেবার মতো ঘটনাও ঘটে যেতে পারে, এই আগাম সাবধানী করে রাখলুম।

সপ্তম জানালা’র সাথে আসা নতুন মাত্রার কিছু গোয়েন্দাপ্রযুক্তি “বিশ্বাসযোগ্য কম্পিউটিং” এই সুর তুলে মাইক্রোসফট নতুন যে প্রযুক্তিটুকু আপনাকে উপহার দিচ্ছে তার চটকদার নাম হচ্ছে – “Palladium”। এটি জার্মান ভাষার একটি শব্দ। তবে ইংরেজী/জার্মান থেকে বাংলায় অনূদিত প্রতিশব্দটি হবে – “রক্ষাকবচ” বা “সুরক্ষার দেবী”। চটকদার এই নামের বাহারে নিজের অজান্তেই আপনার কম্পিউটারে কি ঘটতে চলছে তা হয়তো এখন বুঝতে পারছেন না। তবে জেনে রাখুন এই প্রযুক্তির পূর্বে প্রোপ্রাইটরী বা মালিকানাধীন সফটওয়্যার গুলোয় ম্যালিশাস বা কম্পিউটারের ব্যবহারকারীর জন্য ক্ষতিকারক কিছু অংশ বা বৈশিষ্ট্য থাকতো বা থাকতে পারতো। আর এই প্রযুক্তি এই ক্ষতিকারক বৈশিষ্ট্যসমূহকেই প্রকারান্তরে বৈশ্বিকভাবে চুড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে দিলো। আরো বিস্তারিত জানতে চাইলে — http://en.wikipedia.org/wiki/Next-Generation_Secure_Computing_Base পড়ে নিতে পারেন।

এই “সুরক্ষার দেবী” কে ব্যবহার করে হলিউড আর বিখ্যাত রেকর্ডিং প্রতিষ্ঠানগুলো আপনার ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তায় অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে পারবে। কিভাবে? তো জেনে নিন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এটা নির্ধারন করা সম্ভব যে কোন কম্পিউটারে একটি সুনির্দিষ্ট চলমান চিত্র বা ভিডিও কিংবা গান ডাউনলোড হয়েছে এবং তারপর সেই নির্দিষ্ট ডাউনলোড করা গান বা ভিডিওটি উক্ত যন্ত্র (পিসি/নেটবুক/ট্যাবলেট পিসি/মুঠোফোন) ব্যতীত আপনারই নিজের অন্য কোন যন্ত্র (পিসি/নেটবুক/ট্যাবলেট পিসি/মুঠোফোন) এ আপনার নিজেরই চালানোর অনুমতি রহিত করা যেতে পারে। ফলে একই জিনিষ বারংবার ডাউনলোড করতে আপনাকে বাধ্য করা হবে। আর যখন এই কাজটুকু নিখুঁতভাবে সব যন্ত্র সমূহে করা হবে তখন নিশ্চয় অতি সহজ হিসাব মেলাতে আপনার কষ্ট হচ্ছে না যে আপনার পিসি/নেটবুক/ট্যাবলেট পিসি/মুঠোফোন এর প্রতিটি ফাইল/নথি আপনার নাকি অন্য কারো নিয়ন্ত্রনাধীনে থাকছে। এখান থেকে আরো একটু বিস্তারিত জানতে পারেন — http://en.wikipedia.org/wiki/Next-Generation_Secure_Computing_Base#Digital_Rights_Management

আর উপরের ঘটনাটা যদি হুবহু ঘটানো হয় তো একপ্রকারে ধরে নেয়া যায় যে আপনার সাথে আপনার পরিচিত সবার সম্পর্ক ছিন্ন হতে চলেছে। কেননা এই প্রযুক্তি আপনাকেই আপনার ডিভাইসগুলোতে আপনারই মালিকানাধীন ফাইলটি শেয়ার করতে দিচ্ছে না তো সেখানে অন্য কারো সাথে সেটা কিভাবে আপনি শেয়ার করবেন। আর যদি এই প্রযুক্তি শুধুমাত্র শেয়ারিং বন্ধ করেই থেমে যেতো তো ভালো ছিলো। তবে তার বদলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ করে তুলছে এই প্রযুক্তি। যেমন ধরুন এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা হলো প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র আর ইমেইলের ক্ষেত্রে, তো কি ঘটবে? একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাইরে সেই নথি আর কারো জন্যেই ব্যবহার উপযোগী থাকবে না। আবার এটাও করা সম্ভব যে নথিটি কম্পিউটার ব্যতীত অন্য কোন যন্ত্রে পড়াও যাবে না। বিস্তারিত পাবেন — http://www.gnu.org/philosophy/no-word-attachments.html

ভুতুড়ে হলেও সত্যি যে এটা করা সম্ভব যে একটা ইমেলই আপনি পেলেন যেটা কিনা দুই সপ্তাহ বাদেই আপনার ইনবক্স থেকে বেমালুম হাওয়া (গায়েব)। ধরুন এমনটা যদি ঘটে যে আপনি যে প্রতিষ্ঠানে চাকুরীরত সেই প্রতিষ্ঠানেরই গুরুত্বপূর্ন কর্তাব্যক্তিদের একজন আপনাকে ইমেইলে এমন একটি বিষয়ে কাজ করতে অনুমোদন/আদেশ দিলেন যেটা ঐ প্রতিষ্ঠানের জন্য জটিল বা বিপদজনক হতে পারে। একমাস পরে আপনার ঐ কাজটুকুর প্রতিফল সত্যি সত্যিই প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপদজনক বা জটিল হয়ে দাঁড়ালো আর তখন এই বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্তগ্রহনকারী বা কর্মসাধনকারী হিসেবে চিহ্নিত হবেন একমাত্র আপনি। কেননা সেই ইমেইলটি প্রমাণ স্বরূপ আপনি দেখাতেই পারলেন না যার প্রধান কারন সেই নির্দেশনা/আদেশটুকু ছিলো এমনই কালি দিয়ে লেখা যা অদৃশ্য হতে পারে। এই বিষয়ে আরো তথ্য পেতে পারেন — http://www.cl.cam.ac.uk/~rja14/tcpa-faq.html

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৩) প্রকাশিত হবে আগামী ১২ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ১) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ২৯শে ডিসেম্বর ২০১১ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।

Posted in খেয়াল করুন, জেনে রাখুন, দেশ ও জাতির প্রতি দ্বায়বদ্ধতা, ভালো লাগা, ভালোবাসা

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ১)


তারিখ: ২৯শে-ডিসেম্বর-২০১১ইং

ভূমিকার পূর্বেঃ “উইন্ডোজ” অপারেটিং সিস্টেম কে আমি “খিড়কী” বা “জানালা” নামে ডাকতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। আমার এ লেখায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি লেখাটা পড়ে আহত হোন বা কষ্ট পেয়ে থাকেন তো সেইজন্যে আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। কিন্তু করার ও তো কিছু নেই। আমার লেখায় যদি আমিই শান্তি না পাই তো লিখবো কি করে‍‍? এই কাজটুকু করাই হতো না যদি না “প্রজন্ম ফোরাম” আর “উবুন্টু বাংলাদেশ” এর মেইলিং লিস্টে কিছু মানুষের ভুল ধারনা কে ভেঙ্গে দিতে কিছু কঠিন মন্তব্য না করতাম আর সেখানে আমাদের গৌতম দা আমাকে এই বিষয়ে বিশদভাবে লেখার জন্য উৎসাহ না দিতেন। গৌতম রয় কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার ভেতরের আমি কে টেনে-হেঁচড়ে বের করে নিয়ে আসবার জন্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটি আমি পর্ব আকারে আসন্ন প্রতিটি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে প্রকাশ করবো। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব। অষ্টম পর্বে লেখার উপসংহার প্রকাশ পাবে ইনশাল্লাহ।

কেন মাইক্রোসফটের নিম্নোক্ত কাজগুলোকে অন্যায় বলেছি তা নিয়ে উত্তেজিত হয়ে যাবেন না যেনো। আগে আমার লেখাটা পড়ে, জেনে, মর্মোদ্ধার করে বুঝে নিন। তারপর যদি দেখেন যে আমার এই লেখা বা মূল সুত্রের লেখায় কোন অংশে ত্রুটি রয়েছে তো আমাকে জানাবেন। আমি সংশোধনীটুকু দেবার/করে নেবার প্রয়াস পাবো। সেই সাথে নিজেও নতুন কিছু জানবার ও শেখবার সুযোগ পাবো। আর আটটি পর্বের কথা তো পূর্বেই উল্লেখ করেছি, তাই লেখাটুকু আট পর্বে সম্পূর্ন প্রকাশিত করবার পূর্বে আমি নিজে এই লেখা নিয়ে কোন প্রশ্নের উত্তর/মন্তব্য দেবো না।

ভূমিকাঃ আমার এই লেখাটি কোন মৌলিক রচনা নয়, সংকলিত একটি অনুবাদ মাত্র, সাথে ব্যক্তিগত কিছ মতামত, মন্তব্য আর চিন্তার প্রকাশ অঙ্গাঅঙ্গীভাবেই জড়িয়েই পুরোটা লেখা হয়েছে। মূল লেখার সুত্রঃ http://en.windows7sins.org/#education-more । আসলে এই কাজটুকু হুবহু অনুবাদের মতো কিছু নয়, চেষ্টা করা হয়েছে যথাসম্ভব সঠিক ভাবটুকু বজায় রেখে সঠিকরুপে, সহজ বাংলায় বর্ননা করতে।

পাদ প্রদীপের আলোটুকু যেখানে নিপতিতঃ এই লেখাটির মূল বক্তব্যই হচ্ছে windows বা “জানালা” অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে, যাঁর মাধ্যমে মাইক্রোসফট আপনার কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রনের জন্য আইনগত দিক থেকে সব রকমের কর্তৃত্বের অনুমতিই নিয়ে নিচ্ছে এবং সেই ক্ষমতাকে সম্পূর্নরূপে অপব্যবহার করে মাইক্রোসফট ঐ কম্পিউটারের সকল ব্যবহারকারীদেরকে অন্যায়ভাবে প্রভাবিত/প্ররোচিত/পরিচালিত করার প্রয়াস নিচ্ছে। তো সেই ‘গুরুতর পাপ’ বা ‘অন্যায়’ যা মাইক্রোসফট করেছে, করছে এবং করতে যাচ্ছে তা সম্পর্কে আপনাদের সবার দৃষ্টি আকর্ষনের জন্যেই আমার এই প্রয়াস।

যে সাতটি ‘পাপ’ বা ‘অন্যায়ে’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ/সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আমার এই লেখা –

১। শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ায় বিষ প্রয়োগ (Poisoning Education)
২। ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তায় অযাচিত হস্তক্ষেপ (Invading Privacy)
৩। একচেটিয়া ব্যবসার লক্ষ্যে অনৈতিক আচরন (Monopoly Behavior)
৪। ব্যক্তি স্বাধীনতায় পরিপন্থী অনৈতিক বাধ্যগতকরণ (Lock-in)
৫। আদর্শমানদন্ডের অপব্যবহার (Abusing Standards)
৬। ডিজিটাল রেষ্ট্রিকশন ব্যবস্থাপনার বলপূর্বক প্রয়োগ (Enforcing DRM)
৭। ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার প্রতি হুমকি (Threatening user security)

আজকে আমি, ১। শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ায় বিষ প্রয়োগ (Poisoning Education) বিষয়ে আলোকপাত করবো

শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন কি? শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে একটা বানী বহুল প্রচলিত আছে – “তুমি একজন মানুষকে একটা মাছ দাও এবং তাঁর একটা দিনের খাবারটুকু নিশ্চিত করো। আর যদি তুমি তাঁকে মাছ ধরতেই শিখিয়ে দাও তো তুমি তাঁর জীবনকালের জন্যেই খাবার নিশ্চিত করবে।”

আমার নিজের বোধ থেকে যদি বলি তো – “মানুষের জীবনধারনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু কে জানতে, বুঝতে ও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শিখতে সে প্রক্রিয়াটুকুর মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাই শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন।”

আমাদের আগামী প্রজন্মের শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন একটি সরঞ্জাম হিসেবে কম্পিউটারের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে, যাঁদের শিক্ষাক্রমে কম্পিউটারকে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তাঁদেরকে শুধুমাত্র একটা সুনির্দিষ্ট কোম্পানীর পন্যের ব্যবহার্যবিধিই শেখানো হচ্ছে: মাইক্রোসফট’র পন্য। মাইক্রোসফট প্রচুর পরিমানে অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে বিভিন্ন পরামর্শদাতা ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান এর জন্য (এমসিপি, এমএসপি) যাতে করে বিপনন প্রকিয়া সহজতর হয় আর শিক্ষা বিভাগের সহায়ক বিষয়গুলোকে নিজের আয়ত্তে আনা যায়।

কিভাবে ঘটছে শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ায় বিষ প্রয়োগ? আসলে মাইক্রোসফটের আয়ের বিশাল খাতসমূহের অন্যতম একটিই হলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষা মাধ্যম আর তাই অত্যন্ত কৌশলে আগামীদিনের নাগরিকদেরকে নিজের পন্যের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে নেয়ার প্রয়াসের শুরুটা এখানেই। শিক্ষামাধ্যমগুলোয় শিক্ষার্থীদেরকে মাইক্রোসফটের বিভিন্ন পন্য এবং এই “জানালা” অপারেটিং সিস্টেম চালনা করতে শেখানোর মাধ্যমে আসলে শিক্ষার্থীদের বাবা-মা/অভিভাবকদেরকে একপ্রকারে বাধ্যই করা হচ্ছে বাসা-বাড়ীতেও সেই একই প্রতিষ্ঠানের পন্য ব্যবহার করতে, অন্যথায় ঐ শিক্ষার্থীর শিক্ষার পরিপূর্নতা বাধাগ্রস্ত হবার ভীতি কাজ করছে। একরকম জোরজবরদস্তি মূলকভাবেই একটা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পন্যকে শিক্ষার্থীদের সামনে বাধ্যতামূলক শিক্ষা উপকরনরূপে উপস্থাপন করার দৃশ্য আর কোথাও কি আপনি দেখতে পান?

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যই মাইক্রোসফটের পন্যের বিপননে সহযোগীতা করে চলেছে, হয়তো মূল বিষয়টা সচেতনভাবেই এড়িয়ে গিয়ে কিংবা সেটা না বুঝেই, যেহেতু ঐ রাজ্য সরকারের উপরে এই প্রতিষ্ঠান তাঁদের দেয়া বিনামূল্যের পন্যগুলোর মাধ্যমে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছে। কেননা মাইক্রোসফটের প্রতিটা সফটওয়্যার/পন্যই মালিকানাধীন এবং আবদ্ধকৃত, যা কিনা “শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জন” এর সাথে পুরোপুরিই অসামঞ্জস্যপূর্ণ – “জানালা” সিস্টেমের ব্যবহারকারীরা আসলে দ্বিতীয় শ্রেনীর গ্রাহক বা অসচেতন ক্রেতা মাত্র। কেননা যখনই একজন ব্যববহারকারী এই “জানালা” সিস্টেমটা ব্যবহার করছে তাঁদেরকে আইনগতভাবেই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বেঁধে ফেলা হচ্ছে যেনো নিজের চাহিদানুযায়ী বা কোন নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানে এই প্রতিষ্ঠান ব্যতীত অন্য কোন সফটওয়্যার তাঁরা ব্যবহার না করতে পারেন, এমনকি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদা নিবারনেও বাঁধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। যেমন উদাহরন স্বরূপ বলা যেতে পারে যদি কেউ ইচ্ছে করে যে আসলে এই “জানালা” সিস্টেম, কোন ব্যবহারকারীর কাছ থেকে নির্দেশনা নেবার পর কিভাবে সেই নির্দেশনাটুকু প্রক্রিয়াকরণ করছে সেটা বিস্তারিত জানবে তো সেটা অসম্ভব, এমনকি এর সোর্সকোডটুকুও গোপন করে রাখা হয়।

শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহারের আসল উদ্দেশ্যই হলো জ্ঞানের ক্ষেত্রে পরিপূর্ন স্বাধীনতা অর্জন এবং তা সুদৃঢ়করণ, এটা নয় যে, কোন একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান কূটকৌশলের প্রয়োগে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখবার পথটুকু সুগম করে নেবে।

মুক্ত সফটওয়্যার গুলো এক্ষেত্রে সঠিক কাজটাই করে থাকে, যা একজন শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করে নিজের জ্ঞানার্জন প্রকিয়াটাকে সুদৃঢ় করতে, বিভিন্ন বিষয়ে নতুন নতুন দিক উন্মোচনের আর শিক্ষা গ্রহনের। আপনি হয়তোবা প্রশ্ন তুলবেন যে, “তাহলে মুক্ত সফটওয়্যার সহযোগে শিক্ষাক্রমের লক্ষ্যে ওএলপিসি বা ওয়াল ল্যাপটপ পার চাইল্ড প্রকল্পে কোন সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রকাশিত হয়নি কেন?” ২০০৩ইং সালে এমআইটি’র প্রফেসর নিকোলাস নেগ্রোপন্টে এই প্রকল্পটি শুরু করেন এই লক্ষ্যে যে বর্তমানের শিশুরা আগামীর শিক্ষা ও প্রযুক্তির ছোঁয়া পাবে তথ্যপ্রযুক্তি আর জ্ঞানার্জনের স্বাধীনতার যুগ্মপৎ প্রয়োগের মাধ্যমে। সেই লক্ষ্যে এই প্রকল্প অতি স্বল্পমূল্যে যন্ত্র তৈরীর উদ্যোগ নেয় (শুরুর দিকের যন্ত্রটির নামকরণ করা হয়েছিলো এক্সও/যো/XO) যেনো লক্ষাধিক শিশু এই যন্ত্রটি ব্যবহার করে সুবিধাভোগী হতে পারে এবং তাতে প্রযুক্ত করা হবে মুক্ত সফটওয়্যার যেনো তাঁরা নিজেদের অর্জিত জ্ঞান এবং মানোন্নয়নকৃত সফটওয়্যার একে অপরের সাথে পছন্দানুযায়ী বিতরন বা শেয়ার করতে পারে। আরো জানতে দেখুন: http://laptop.org/en/vision

তো ঠিক এই পর্যায়ে এসেই মাইক্রোসফট এতটাই চাপ প্রয়োগ করতে থাকে এই প্রকল্পে যে নেগ্রোপন্টে এই প্রকল্পের মূল যে লক্ষ্য সেই স্বাধীনতা বা মুক্তপ্রযুক্তি’র প্রতিশ্রুতিটুকু থেকে পিছিয়ে এসে ঘোষনা করতে বাধ্য হন যে এই প্রকল্পের যন্ত্রগুলোয় স্বাধীনতা খর্বকারী “জানালা এক্সপি” চালানোর ব্যবস্থাও রাখা হবে। (http://www.olpcnews.com/files /microsoft_emails_on_olpc.pdf )

মাইক্রোসফট শুধু এই হুমকি প্রদানের মাধ্যমেই ক্ষ্যান্ত দেয়নি, বর্তমানে মাইক্রোসফটের লক্ষ্য সেই সকল দেশের সরকার যাঁরা এই XO বা যো নামের যন্ত্রগুলো কিনছে, যেনো সরকারের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করিয়ে ওই যন্ত্রগুলোর মধ্যকার মুক্ত সফটওয়্যারগুলোকে “জানালা” এবং সহায়ক মালিকানাধীন সফটওয়্যার দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়। মাইক্রোসফট এই উদ্যোগে কতটুকু সফল, তা আগামীই বলে দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত করেই বলা যায় যে নিজের পুরো ক্ষমতাটুকু খাটিয়ে এই হুমকি প্রদানের মাধ্যমে মাইক্রোসফট এমন একটি প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করেছে যা কিনা ইতোমধ্যে দশ লক্ষ হতদরিদ্র শিশুর জন্য বিশ্বজুড়ে বিতরন করা হয়েছিলো স্বল্পমূল্যে এবং মুক্ত সফটওয়্যার চালিত প্রযুক্তিতে এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ঐ শিশুদেরকে এখন নিজের পন্যের প্রতি একান্তই নির্ভরশীল করবার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। ওএলপিসি প্রকল্পে এই হুমকি প্রদান হচ্ছে এমনই একটা উদাহরন যার মাধ্যমে মাইক্রোসফট প্রমাণ করেছে যে, মাইক্রোসফট কিভাবে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকারকে এই ভ্রান্তধারনার প্রতি অনুরক্ত করে থাকে যে, কম্পিউটার প্রযুক্তির ব্যবহারে শিক্ষা মানেই হলো “জানালা” অপারেটিং সিস্টেম ও অন্যান্য সকল অনুষঙ্গ সফটওয়্যার।


“আমাকে অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাতে হচ্ছে মিঃ ক্রাইষ্ট. যে আপনি শুধুমাত্র দুইটি মাছ ও পাঁচটুকরো রুটির জন্যেই আমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ। অন্যরা বেশী কিংবা কম যা খুশি পান না কেন, আপনি এর বেশী আর কিছুই পেতে পারেন না।”

সমগ্র বিশ্বকে এই ভয়ংকর অবস্থা থেকে বের করে নিয়ে আসতেই মুক্ত সফটওয়্যার ফাউন্ডেশন (Free Software Foundation বা FSF) কাজ করে যাচ্ছে।

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ২) প্রকাশিত হবে আগামী ৫ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।