বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৪)


তারিখ: ১৯শে-জানুয়ারী-২০১২ইং

অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে “উইন্ডোজ” অপারেটিং সিস্টেম কে আমি “খিড়কী” বা “জানালা” নামে ডাকতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। আমার এ লেখায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি লেখাটা পড়ে আহত হোন বা কষ্ট পেয়ে থাকেন তো সেইজন্যে আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। কিন্তু করার ও তো কিছু নেই। আমার লেখায় যদি আমিই শান্তি না পাই তো লিখবো কি করে‍‍? এই কাজটুকু করাই হতো না যদি না “প্রজন্ম ফোরাম” আর “উবুন্টু বাংলাদেশ” এর মেইলিং লিস্টে কিছু মানুষের ভুল ধারনা কে ভেঙ্গে দিতে কিছু কঠিন মন্তব্য না করতাম আর সেখানে আমাদের গৌতম দা আমাকে এই বিষয়ে বিশদভাবে লেখার জন্য উৎসাহ না দিতেন। গৌতম রয় কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার ভেতরের আমি কে টেনে-হেঁচড়ে বের করে নিয়ে আসবার জন্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটি আমি পর্ব আকারে বিগত ২৯শে ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী প্রতিটি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে প্রকাশ করছি এবং করবো ইনশাল্লাহ। আজ প্রকাশিত হলো চতুর্থ পর্ব। অষ্টম পর্বে লেখার উপসংহার প্রকাশ করার ইচ্ছে রয়েছে। আপনার আগ্রহ থাকলে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বের লেখাগুলো একটু সময় করে পড়ে নিতে পারেন।

আজকের লেখায় আমি, ৪। ব্যক্তি স্বাধীনতায় পরিপন্থী অনৈতিক বাধ্যগতকরণ (Lock-in) বিষয়ে অতি সহজ ভাষায় কিছু কথা বলতে চেষ্টা করেছি। আশা করি এ বিষয়ে আপনাদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হবো।

যুদ্ধ, নাকি মহড়া? প্রতি বছর প্রতিটা দেশের সশস্ত্রবাহিনীর কমপক্ষে একটি যুদ্ধকালীন মহড়া হয় — এ বিষয়টা তো নিশ্চয়ই সবাই মোটামুটি জানেন? আমার প্রশ্ন হলো এই যে মহড়া তাতে কি জনতা/জনসাধারন কে ইচ্ছেকৃতভাবে মেরে ফেলা কিংবা অত্যাচার করা হয়? নাকি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আমাদের সেনা/নৌ/বিমানবাহিনী কতটুকু সক্ষম তা বুঝতে সত্যি সত্যিই কোন যুদ্ধ লাগিয়ে দিতে হয় দেশের কোন একটা অংশে? সবাই নিশ্চয়ই এইটুকুতে একমত হবেন যে এই ধরনের মহড়ায় অংশ নেবার জন্য আসলে সশস্ত্র বাহিনীরই একটা অংশ কে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে যুদ্ধের (একটা নাটক) আবহ সৃষ্টি করে তা উপস্থাপন করা হয়।

এই মহড়াগুলোতে বিমানবাহিনী যখন বিপক্ষ শিবিরের কোন লক্ষ্যে বোমা/গোলা/গুলিবর্ষন করে তো তাঁর আগে লক্ষ্যবস্তুটাকে চিহ্নিত এবং স্থির করে থাকে। যদি সেটা বিমান বা চলমান কোন বস্তু হয় তো? তবে সেটাকেও একইভাবে নিজের গুলি/মিসাইলের সীমায় এনে লক্ষ্যস্থির করে নেয় বিমানসেনারা। এই লক্ষ্যস্থির করা বা লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত হানবার আগে নিয়মিত নজরে রাখার প্রযুক্তিটিকেই বলা হয়ে থাকে লক-ইন (Lock-in)। এরমানে হলো লক্ষ্যবস্তু একবার লকইন হবার পরে যদি ভৌগলিক অবস্থানের পরিবর্তনও হয় তো সমস্যা নাই, বিমান থেকে ছোঁড়া বোমা/মিসাইল লক্ষ্যবস্তুকে ঠিকঠাক আঘাত হানতে পারবে।

লেখার শুরুটা পড়েই এতক্ষনে আপনাদের মনে হয়তোবা সন্দেহের দানাবাঁধতে শুরু করে দিয়েছে যে, লেখক সম্ভব মিলিটারী বা প্যারামিলিটারী ফোর্স নিয়ে বেশ জমাটজমাট কিছু লিখবেন। ভয়ের কিচ্ছু নেই আমি আপনাদেরকে আশ্বস্ত করছি এই লেখা কোন সামরিক কোন বিষয়বস্তু নিয়ে নয় বরংচ আমাদের দৈনন্দিন প্রযুক্তি জীবনে একটি প্রতিষ্ঠান কিভাবে আমাদেরকে নিজের সফটওয়্যারের মাধ্যমে ”বাধ্যগত এবং নজরবন্দী” (লকইন) করে রেখেছে তাই ধীরে ধীরে আপনাদের সামনে উন্মোচন করতে চেষ্টা করবো। তো আসুন, দেরী না করে শুরু করা যাক? আচ্ছা ঠিক আছে, মূল লেখায় যাবার আগে ছোট্ট একটা কুইজ করি আপনাদের জন্য। পুরষ্কার হিসেবে পরের লেখাটুকু দিলাম। এবারে একটু হাসুন।🙂

বলুন দেখি ??
১. ধরুন আপনি উইন্ডোজ এক্সপি’র লাইসেন্সকৃত কপি ব্যবহার করে থাকেন। তো বর্তমানে আপনার এক্সপি সিস্টেমে কোন হার্ডওয়্যারের সাপোর্টে সমস্যা হচ্ছে এবং আপনি এই বিষয়ে মাইক্রোসফটের দ্বারস্থ হলেন, যেহেতু আপনি তাঁদের একজন গুরুত্বপূর্ন গ্রাহক। তাঁরা আপনাকে এই এক্সপি সিস্টেমে হার্ডওয়্যারটুকু সাপোর্ট করাবার বিষয়ে কি সেবা দেবে?

২. আপনি অনলাইনে নিয়মিত থাকেন আপনার এক্সপি/ভিসতা সিস্টেম ব্যবহার করে। প্রতিবারই নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে আপনি সিস্টেম আপডেট বললেই কিছু জিনিষ ডাউনলোড এবং ইন্সটল হয়ে যায়। কোথায় নামলো? আপডেট হিসেবে কি কি আপনার কম্পিউটারে নামলো? আপডেটগুলো আপনার জন্য কিভাবে উপকারী/অপকারী এই বিষয়গুলোতে কোন তথ্য কি আপনি জানেন/আদৌ জানানো হয় আপনাকে?

৩. এক্সপি চালাতে গেলে আপনার সিস্টেমে ৫১২ মে.বা মেমরী বা RAM থাকলে ভালো হয়, ভিসতা চালাতে গেলে সেটা ১জি.বি আর সেভেন চালাতে গেলে ১জি.বি’র নীচে কিছু হলে চলবেই না। আচ্ছা বলুন তো আপনি এভাবে প্রতিবারে নতুন ওএস লোড করতে গিয়ে কত টাকার নতুন হার্ডওয়্যার কিনেছেন/কিনতে বাধ্য হয়েছেন? ব্যয়িত অর্থগুলোর সদ্ব্যবহার করতে পেরেছেন কি? নাকি তাঁর আগেই আবারো আপগ্রেডের ঝামেলায় পড়েছেন?

৪. আচ্ছা বলুন তো দেখি এমএস অফিসের বর্তমান সংস্করনের আদর্শমানে তৈরী করা নথিপত্র আপনারই পূর্বে লাইসেন্সকৃত কোন একটি এমএস অফিসের সংস্করনে চালাতে গেলে কতটা ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়?

৫. এমএস অফিস বাদ দিয়ে আপনি যদি অন্য কোন অফিস স্যুইট আপনার “খিড়কী” সিস্টেমে ব্যবহার করেন তো সেক্ষেত্রে সিস্টেমের পারফরমেন্স কি কিছুটা কমে যায়/স্লো মনে হয়?

৬. আপনার বর্তমান সফটওয়্যারটির (এমএস উইন্ডোজ/অফিস) লাইসেন্স কি বিনামূল্যেই নতুন সংস্করনের সফটওয়্যারে আপনাকে আপগ্রেড করতে দেয়?

ওপরের ছয়টি প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলে উপহার/পুরষ্কার হিসেবে এখন নিচের লেখাটুকু পড়তে শুরু করুন।

মাইক্রোসফটের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের অংগরাজ্যগুলো এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সুরক্ষা বিভাগের সেই ঐতিহাসিক মামলাটার নাম মনে আছে তো আপনার? “এন্টিট্রাস্ট মামলা”। এই মামলায় জড়িয়ে পড়বার আগে মাইক্রোসফটের যে বিপনন ব্যবস্থা তাঁর মূলনীতি ছিলো সেই বিখ্যাত তিনটে E, যথাক্রমে Embrace, Extend and Extinguish। মামলা চলাকালীন ইন্টেলের ভাইসপ্রেসিডেন্ট স্টিভেন ম্যাকগেডি এই বিষয়টা নিশ্চিত করেন এবং সাক্ষ্য দেন যে, “মাইক্রোসফটের ভাইসপ্রেসিডেন্ট পল মারিটজ এটা উল্লেখ করেছিলেন ইন্টারনেট, জাভা এবং নেটস্কেপ বিষয়ে মাইক্রোসফটের কর্মপরিকল্পনাটুকু ইন্টেল কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার সময়ে।” এখানে যে Embrace বা কাছে টানা বা জড়িয়ে ধরা বা বন্ধনে আবদ্ধ করা, তারপরে Extend বা প্রসারিত করা বা টেনে লম্বা করা এবং তারপরে Extinguish বা বন্ধ করা বা থামিয়ে দেবার কথা উল্লেখ করা হয়েছে আসুন তাঁর বাস্তব চিত্রটা একটু দেখে নিই।

মাইক্রোসফটের এই ‘E’ত্রয়ী সম্পর্কের বাঁধনে জড়িয়ে ছিলো নোভেল, আসুস এবং ইন্টেলের মতো বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। এবং ফলাফল স্বরুপ আসুসের ঐ চুক্তির পরেই আসুসের EEE PC এর লভ্যাংশের ৯৪ শতাংশই হারিয়ে বসে। কিভাবে সেটা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। আর চুড়ান্ত মার তো খায় সাধারন ব্যবহারকারীরা। কেননা আসুসের এই পিসিগুলোর সাথে বান্ডেলড অবস্থায় আসতে শুরু করে “খিড়কী” আর ব্যবহারকারী নিজে না চাইলেও ব্যবহারে/অভ্যস্ত হতে বাধ্য হয় সেই সিস্টেমেই। একইভাবে নোভেলের সাথে চুক্তি করার পর নোভেলের ভিএমওয়্যার ব্যবসায়ে মার খেতে শুরু করে আর আজ মাইক্রোসফটের ভার্চুয়ালাইজেশন টেকনোলজি ক্রমশ ব্যবসায়িক পন্য হয়ে উঠছে। ফলাফলে কি হলো এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মাইক্রোসফট একদিকে যেমন তাঁদের বাতিল করে দেয়া পন্য (জানালা এক্সপি) বিপনন করলো একই সাথে ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক লভ্যাংশে ভাগ বসালো। উপরস্তু ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন ক্ষতির দায়ভারও নিলো না। তারমানে এই ‘E’ত্রয়ী হলো “বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে, দমআটকে স্তব্ধ করে দেবার” একটা শর্তভান্ডার। এরকম আরো কিছু ঘটনা আছে মাইক্রোসফটের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর। আরো বিস্তারিত জানতে চাইলে পড়ে নিতে পারেন —
১। http://en.wikipedia.org/wiki/Embrace,_extend_and_extinguish
২। http://techrights.org/2009/07/27/antimonopoly-service-steps-in
৩। http://techrights.org/2009/04/24/microsoft-pays-asus-claim
৪। http://techrights.org/2009/06/04/microsoft-embracing-extending-netbooks
৫। http://techrights.org/2009/05/06/asustek-falls-with-windows
৬। http://www.zdnet.com/blog/microsoft/microsoft-hits-back-on-expanded-novell-vmware-alliance/6509

আর চুড়ান্তভাবে এই মাইক্রোসফটের এই লক্ষ্যবস্তুর শিকার হলো কিন্তু শুধুমাত্রই ঐ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো নয়। কারা বলুন তো? ধরতে পারছেন নিশ্চয়ই? হ্যাঁ আমরা এই সাধারন ব্যবহারকারীরাই হলাম সেই “লক্ষ্যবস্তু” যা কি না মাইক্রোসফটের নজরে বন্দী হয়ে গেলাম। এখন তো আরো বড়ো খটকা বেঁধে গেলো মনে, তাই না???

কিভাবে হলাম আমরা মাইক্রোসফটের “বিপনন মিসাইলের” সেই সুনির্দিষ্ট “লক্ষ্যবস্তু”?!!! এই জন্যেই আমার এই লেখার শিরোনাম আমি দিয়েছি — “বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে”। আচ্ছা খেয়াল করে দেখুন তো আপনার জন্য আজকের কুইজের প্রথম প্রশ্নটা কি ছিলো। আর তার উত্তরে আপনি কি জবাব পেয়েছিলেন? বেশ আপনার মনের সাথে আমার কথা(লেখা)টুকু মিলিয়ে নিন। উত্তরটা ছিলো মাইক্রোসফট খুব সুন্দর করে আপনাকে মেইল দিয়ে জানাবে যে তাঁদের বর্তমান প্রযুক্তিতে আপনি চলে আসুন, সপ্তম জানালা (উইন্ডোজ সেভেন) ব্যবহার করা শুরু করুন। কেননা এক্সপি এর সবরকম বিপনন আর আপডেট প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মাইক্রোসফট ইতোমধ্যেই বন্ধ করে দিয়েছে এবং সে আর আপনাকে এই সংক্রান্ত কোন সহায়তা আর দেবে না। মানে সহজ ভাষায় বিগত দুই/তিন/পাঁচ বছরের জন্য আপনি তাঁদের পন্যের ক্রেতা ছিলেন। যদি আর কোন নতুন পন্য আপনি না কেনেন তো আপনাকে আর কোনরকম সহায়তা সে দেবে না। একবার চিন্তা করুন তো এই “খেল খতম, পয়সা হজম” টাইপের আচরন যদি আপনার পাড়ার মুদি দোকানদার করে তো আপনি তাঁর চেহারার ভৌগলিকতায় কি কি পরিবর্তন আনতে পারেন? কিন্তু আফসোস! মাইক্রোসফটের চুলটিও আপনি ছুঁতে পারবেন না। কেননা পন্য বিক্রয়ের সময় তাঁর চুক্তিপত্রেই সে স্পষ্ট লিখে রেখেছে যে ঐ সফটওয়্যার আপনি সম্পূর্ন নিজ দ্বায়িত্বে কিনছেন এবং এটার কারনে আপনার কোন সমস্যা হলে সেটা নিয়ে মাইক্রোসফটের কোন দায়বদ্ধতা নেই। তবে হ্যাঁ এই বিষয়ে দায়বদ্ধতা না থাকলেও নিজের নতুন পন্য আপনাকে কিনতে বাধ্য করার জন্য আপনার লাইসেন্সকৃত সফটওয়্যারটি আপনাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে বাধ্য করার মতো বাধ্যবাধকতা সে সম্পূর্নই নির্দ্বিধায় এবং হৃষ্টচিত্তে পালনে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ।🙂

এইটুকুতে মাইক্রোসফট যদি থেমে থাকতো তো চলতো। “বকরী হালাল” করার আগে যেভাবে কষাই তাকে প্রচুর পানি খাওয়ায় ঠিক তেমনি আপনার জন্য মাইক্রোসফট নিজের নতুন পন্যের বিভিন্ন সুবিধা তুলে ধরে বিজ্ঞাপন দেয়। একই সাথে পুরোনো প্রযুক্তির সর্বশেষ প্যাচ/আপডেট বলে একটা কিছু অনলাইনে ছেড়ে দেয় যেটাতে প্রচুর বাগ বা সমস্যা বা ত্রুটি থাকে। ফলে আপনার স্ট্যাবল সিস্টেম আনস্টেবল হয় আর আপনি যখন সাপোর্টের জন্য মাইক্রোসফটকে বলেন তো সে আপনাকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে ঠিক ঐ জায়গাতেই নিয়ে আসে যেনো আপনি নতুন পন্যটা কেনেন। ছোট্ট একটা উদাহরন দিই — এক্সপি’র সার্ভিস প্যাক টু ছাড়া হয়েছিলো সার্ভিস প্যাক ওয়ানের কিছু বাগ ফিক্স করতে। কিন্তু দেখা গেলো সার্ভিস প্যাক ২ ইন্সটল করার পরপর সিস্টেম আগের চাইতে ধীরগতির হয়ে পড়েছে। উপায়ান্তর না দেখে যদি সাপোর্টের জন্য যোগাযোগ করা হয়েছে তো অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে, দ্রুতই সমস্যাটা সমাধিত হবে। কিন্তু আসলে দেখা গেলো এর ফাঁকেই ভিস্তা চলে আসলো। তখন বলা হলো ভিস্তায় আপগ্রেড করতে, তাহলেই সমস্যার সমাধান নিমিষেই। কিন্তু এই নিমিষের সমাধান হাতে পেতে গেলে যে শুধু সফটওয়্যার কিনলেই হবে এমনটা নয়। কিনতে হবে কিছু নতুন হার্ডওয়্যারও। কেননা এক্সপি এর চাইতে ভিস্তার সিস্টেম রিকয়ারমেন্ট অনেক বেশী।

ভালো কথা, হার্ডওয়্যারের বিষয়ে যখন চলেই আসলাম তো আসুন ফিরে দেখি একটু পেছনে। আপনার এক্সপি মেশিনের হার্ডওয়্যারগুলো আপগ্রেড করতে হলো ভিস্তা চালানোর জন্য। তাহলে আগের প্রসেসর, মেমরী, হার্ডডিস্ক, মাদারবোর্ড এগুলো কি করবেন? হুমম!!! উপায় হলো — হয় সেগুলো ভাগাড়ে ফেলে দিন নয়তো আগের সিস্টেম নিয়েই জোর করে সন্তুষ্ট থাকতে চেষ্টা চালান। এই যে দুমদাম নষ্ট বা অচল না হওয়া স্বত্ত্বেও একটা হার্ডওয়্যার আপনাকে ডাম্প বা অব্যবহার্য করতে বাধ্য করা হচ্ছে এটা কি অপরাধ নয়? এটা কি বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় নয়? এটা কি অর্থনীতির উপরে অনৈতিক উপায়ে চাপ সৃষ্টি করা নয়? আরো বিস্তারিত জানতে — http://www.google.com/search?q=microsoft+forced+upgrade আর যাচাই বাছাই করার জন্য http://ur1.ca/ctsi এটা আপনাকে যথেষ্ট সহায়তা করবে।😉

এডোবি’র মতো প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের ডিআরএম প্রযুক্তির ব্যবহার করে ফ্লাশ প্লেয়ারটা আপডেট করতে ব্যবহারকারীকে একরকম বাধ্য করে। তা নাহলে আপনি ওয়েব থেকে ব্রাউজারে ফ্লাশ ভিডিওগুলো চালাতেই পারবেন না। আর সেই ছুঁতোয় আপনার সিস্টেমের সব রকম মিডিয়ার তথ্য সে পড়ে নেয়। এটা কি আপনার ব্যক্তিতথ্য সবার সামনে উন্মুক্ত করতে আপনাকে ”বাধ্যগত এবং নজরবন্দী” (লক-ইন) করা নয়?

মাইক্রোসফটের “খিড়কী”র প্রতিটা সংস্করনে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন ত্রুটি রেখে দেয়া হয় যেনো সেগুলোকে ব্যবহার করে ক্র্যাকাররা বিভিন্ন কোম্পানীর তথ্য চুরি/ক্ষতিসাধন করতে পারেন। এবং এ ধরনের বিষয়ে চুক্তিপত্র (EULA) তে নিজের দায়টুকু এড়িয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে একটা প্রতিষ্ঠান কিংবা সাধারন ব্যবহারকারী বাধ্য হন বিভিন্ন অ্যান্টিভাইরাস, ম্যালওয়্যার প্রটেক্টর সফটওয়্যার কিনতে। আবার ঐ সফটওয়্যার গুলোও আপনাকে বছরে বছরে লাইসেন্স রিনিউ করে চালিয়ে যেতে হবে। এটা কি আপনাকে ”বাধ্যগত এবং নজরবন্দী” (লক-ইন) করা নয়?

তাহলে চুড়ান্তভাবে যদি সবকিছুকে একত্রে বিবেচনা করি তো কি পাচ্ছি আমরা? আমরা কি এটা দেখতে পাচ্ছি না যে, মাইক্রোসফট তাঁর ক্রেতাদেরকে নিজের স্বেচ্ছাচারীতার জালে আটকে নিয়েছে? যদিও বা ক্রেতা কোন একটা পথ খুঁজে নতুন করে কিছু একটা করতে চেষ্টা করে তো সে রাস্তা যেভাবে হোক মাইক্রোসফট বন্ধ করে দেবে। যেখানেই যান, যাই করুন, প্রযুক্তির জগতে থাকলে মাইক্রোসফট ছাড়া আর কোন গতি মিলবে না এমন বিশ্বাস নিয়েই আগামীর প্রজন্মের পথে বাধা সৃষ্টি করে দাঁড়াচ্ছে?

“আপনার বাঁশ আপনি নিন। বাঁশ মার্কায় ভোট দিন।” মাইক্রোসফট তাঁর পন্যের ক্রেতাদের সাথে যে চুক্তিপত্রের ভিত্তিতে আবদ্ধ থাকে (EULA) সেটাতে একটু ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিন। এটা পেয়ে যাবেন মাইক্রোসফটের প্রতিটা পন্যের সাথেই। তারপরেও একটা লিংক দিয়ে দিলাম — http://en.wikipedia.org/wiki/End-user_license_agreement। দেখে নিন। স্পষ্টতই বুঝে যাবেন কেন লিখলাম এই কথা। অবশ্য তুলনা করতে হলে আপনাকে জিপিএল লাইসেন্স বা মুক্ত সফটওয়্যারের নীতিমালাগুলোও একবার দেখতে হবে। এটা পাবেন — http://en.wikipedia.org/wiki/Free_software_license। এ দুটোর প্রধান পার্থক্য একটাই — মুক্তি বা স্বাধীনতা। মুক্ত সফটওয়্যার আপনাকে দেবে মুক্ত আর স্বাধীনভাবে আপনার কম্পিউটিং অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ আর সেখানে মাইক্রোসফট তেল ছাড়াই, আপনারই পয়সা দিয়ে কিনিয়ে নিয়ে, গাঁইটযুক্ত . . আপনার . . প্রযুক্ত করে দেবে। আগে তো ডাইক্লোফেনাক সাপোজিটরী ব্যবহারে ব্যথা মুক্ত হোন, তারপরে না হয় মুক্ত আর স্বাধীনতার বিষয়টাতে মাথা মারবেন।

আমি নিজে এই ব্যথামুক্ত, স্বাধীন দুনিয়ার বাসিন্দা বিগত প্রায় একযুগ যাবৎ (ব্যক্তিগত এবং কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার)। আর তাই সবাইকে এই আনন্দময়, মুক্ত ও স্বাধীন দুনিয়ায় আহ্বান জানাতে আর মাইক্রোসফটের বিভিন্ন কুটকৌশল নিয়ে সাধারন কম্পিউটার ব্যবহারকারীদেরকে সচেতন করে তুলতেই আমি এই লেখাটা লিখতে শুরু করেছিলাম। বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৫) প্রকাশিত হবে আগামী ২৬শে জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ১) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ২৯শে ডিসেম্বর ২০১১ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ২) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ৫ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৩) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ১২ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।

2 thoughts on “বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৪)

  1. এতকিছুর পরেও লিখে যাচ্ছেন এবং যাবেন আশা করি। লেখার সারকথা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই, মানুষ আরো সচেতন হোক এটাই কামনা করি। ধন্যবাদ।

  2. আমিও মুক্ত প্রযুক্তিতে আছি। সেই প্রথম পর্ব থেকেই পড়ি আর মনে মনে হাফ ছাড়ি যাক বাবা আমি আর এই খুনের মধ্যে নেই। খুন বলছি স্বাধীনতার খুনকে।

    তবে মুক্ত প্রযুক্তিকে এখনো অনেক দূর যেতে হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঘুরে ফিরে যখন সেই খিড়কির কাছেই চলে আসি তখন বেশ খারাপ লাগে।

লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s