Posted in খেয়াল করুন, জেনে রাখুন, দেশ ও জাতির প্রতি দ্বায়বদ্ধতা, ভালো লাগা, ভালোবাসা

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৫)


তারিখ: ৩১শে-জানুয়ারী-২০১২ইং

অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে “উইন্ডোজ” অপারেটিং সিস্টেম কে আমি “খিড়কী” বা “জানালা” নামে ডাকতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। আমার এ লেখায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি লেখাটা পড়ে আহত হোন বা কষ্ট পেয়ে থাকেন তো সেইজন্যে আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। কিন্তু করার ও তো কিছু নেই। আমার লেখায় যদি আমিই শান্তি না পাই তো লিখবো কি করে‍‍? এই কাজটুকু করাই হতো না যদি না “প্রজন্ম ফোরাম” আর “উবুন্টু বাংলাদেশ” এর মেইলিং লিস্টে কিছু মানুষের ভুল ধারনা কে ভেঙ্গে দিতে কিছু কঠিন মন্তব্য না করতাম আর সেখানে আমাদের গৌতম দা আমাকে এই বিষয়ে বিশদভাবে লেখার জন্য উৎসাহ না দিতেন। গৌতম রয় কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার ভেতরের আমি কে টেনে-হেঁচড়ে বের করে নিয়ে আসবার জন্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটি আমি পর্ব আকারে বিগত ২৯শে ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী প্রতিটি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে প্রকাশ করছি এবং করবো ইনশাল্লাহ। তবে বিগত বৃহস্পতিবারে (২৬শে জানুয়ারী) পঞ্চম পর্বটি প্রকাশ করতে পারিনি। কেননা আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং অতিরিক্তমাত্রার যন্ত্রনাভোগ করেছি এই কটা দিন। তাই আমি আপনাদের সবার কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আজ একটু সুস্থবোধ করছি আর তাই প্রকাশ করলাম লেখার পঞ্চম পর্ব। অষ্টম পর্বে লেখার উপসংহার প্রকাশ করার ইচ্ছে রয়েছে। আপনার আগ্রহ থাকলে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পর্বের লেখাগুলো একটু সময় করে পড়ে নিতে পারেন।

আজকের লেখায় আমি, মাইক্রোসফট কর্তৃক ৫। আদর্শমানসমূহের অপব্যবহার (Abusing Standards) বিষয়ে যথা সম্ভব সহজ ভাষায় কিছু কথা বলতে চেষ্টা করেছি। আশা রাখি আজকে কিছু বিষয় চিরস্থায়ী রূপে আপনাদের মনে গেঁথে দিতে সক্ষম হবো।

“আদর্শমান” কি? আমি জানি আমার আজকের এই লেখারটুকুর বিষয়বস্তু দেখেই অনেকেরই মনে এই প্রশ্নটা জেগে উঠেছে। মাইক্রোসফটকে সবাই প্রযুক্তির জগতে একটা মহীরূহ ধরে নেন এবং তাই একান্ত মনেই হয়তোবা এটাও কল্পনা করে থাকেন যে মাইক্রোসফটই হলো আসলে নতুন নতুন সব প্রযুক্তির পথপ্রদর্শক, সৃষ্টির সূতিকাগার। কিন্তু আসলে বিষয়টা ঠিক উল্টো। “মাইক্রোসফট” এর পন্যগুলোর চেহারা থেকে শুরু করে সুবিধা/বৈশিষ্ট্য আর বিপননের ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখতে পাবেন যে আসলে মাইক্রোসফট সব সময়েই কোন একটি প্রতিষ্ঠানের পন্যকে নকল করেছে কিংবা প্রযুক্তি ধার করে এনে খুবই লোভনীয় মূল্যে আর স্বল্পতম সময়ে বাজারজাতের খেলায় মেতেছে। আর এই স্বল্প সময়ে যেহেতু সে প্রযুক্তিটা সে বাজারে ছাড়ছে এবং যেহেতু প্রযুক্তিটা তাঁর তৈরীকৃত নয় তাই এই প্রযুক্তির ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো তাঁর সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার পন্যগুলোতে রয়েই গেছে, সেই শুরু থেকে আজ অবদি।

আমরা তো সবাই নিশ্চয়ই জানি যে, খাদ্যবস্তুর মানদন্ডের বিচারে “দুধ (Milk)” কে বলা হয় আদর্শ খাবার। কেননা একজন পূর্ন বয়স্ক মানুষের দৈহিক পুষ্টিচাহিদার প্রায় সবটুকুই এই দুধে পাওয়া সম্ভব। তাই যখন দুধকে আদর্শ খাবার বলা হয় তাহলে —

১. নিশ্চয়ই গরু কিংবা ছাগল কিংবা ভেড়া কিংবা উট কিংবা এই রকম দুগ্ধদানকারী প্রানীগুলোকেই আদর্শখাবারের ভান্ডার হিসেবে ধরে নেয়া যায়?

২. যদি মানব শিশু কিংবা অন্য কোন প্রানীর বাচ্চার বিষয়ে দুধ কে খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হয় তো সেক্ষেত্রে নিশ্চয়ই ঐ শিশু কিংবা প্রানীর বাচ্চাটার মায়ের বুকের দুধকেই বেশী প্রাধান্য দেয়া হবে?

৩. যদি মায়ের বুকের দুধই বাচ্চার জন্য প্রধান এবং আদর্শ খাদ্য হয় একটা নির্দিষ্ট সময় অবদি আর যদি কোন কারনে সেটার অভাব ঘটে তাহলে কি বাচ্চাটার শারীরিক আর মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না?

৪. যদি এমনটাই হয় যে মা এই সদ্যজাত বাচ্চাটাকে নিজের অসুস্থতার কারনে অন্য কোন বাইরের খাবার কিংবা অন্য কোন প্রানীর দুধ খাওয়ালেন, তাহলে কি ঐ বাচ্চা তাঁর জন্য নির্ধারিত পুষ্টিটুকু পেয়ে যাবে?

৫. গোয়ালা বা দুধওয়ালা যদি আপনাকে খাঁটি দুধ না দিয়ে ভেজাল দুধ দেয় তো সেক্ষেত্রে বাচ্চাটার উপকারের স্থলে কি বিরাট ক্ষতি হবার সম্ভবনা থাকে না?

৬. আর যদি সেই পুষ্টিটুকু পূরন করা না যায় কিংবা মা যদি বাইরের কোন খাবার কিনতে অক্ষম হন আর বাচ্চাকে নিজের সেই অসুস্থ শরীরের দুধই বাচ্চাটাকে দিতে থাকেন তো বাচ্চাটার জন্য সেটা কি উপকারী না অপকারী?

এবারে যদি সেই “মা” এর স্থলে “সাধারন কম্পিউটার ব্যবহারকারী বা আপনার নিজেকে”, “বাচ্চা”র স্থলে “আপনার প্রিয় ডেস্কটপ/ল্যাপটপ/নেটবুক/ট্যাবলেট”কে, “গোয়ালা/দুধওয়ালা” হিসেবে “মাইক্রোসফট” কে, আর “দুধ” হিসেবে “সফটওয়্যার”কে বিবেচনা করা হয় তো আপনি নিজেই পরিস্থিতিগুলো বিবেচনা করে দেখুন তো “দুধের” ভেজাল বা ত্রুটির ঘটনার ফলাফল অবশেষে কি দাঁড়াচ্ছে? আর পরিস্থিতি সামাল দিতে তাহলে বর্তমানে আপনার করনীয় কি? আশা রাখি এই সমস্যাগুলোর সবচাইতে কার্যকরী ও সহজতর সমাধান এই লেখার বাকি অংশ পড়তে পড়তেই পেয়ে যাবেন। 🙂

প্রযুক্তির দুনিয়ায় “আদর্শমান” সমূহ কি? খুব সহজ-সরল ভাষায় বললে — প্রযুক্তির বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করা এবং যান্ত্রিকরূপে একে সামগ্রিকভাবে সব প্রতিষ্ঠানকর্তৃক একইভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে সকল প্রযুক্তিপন্য ব্যবহারকারীদেরকেই একে অপরের সাথে তথ্যের আদান-প্রদান এবং ব্যবহার সহজীকরণের জন্য যে নীতিমালা করা হয় সেটাই “প্রযুক্তির দুনিয়ায় আদর্শমান”রূপে চিহ্নিত হয়ে থাকে।

তার মানে হলো এই আদর্শমান সকল প্রযুক্তিপন্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান ব্যবসাক্ষেত্র সৃষ্টি করে থাকে। এবং সকল প্রযুক্তিব্যবহারকারীদেরকে বেছে নেবার সুযোগ সৃষ্টি করে যেনো তাঁরা নিজের পছন্দমতো নিজের পছন্দের সফটওয়্যার/হার্ডওয়্যারটি কিনতে/ব্যবহার করতে পারেন। একই সাথে এই আদর্শমান নিশ্চিত করে থাকে তথ্যের সুরক্ষা এবং আগামীদিনের প্রযুক্তির সাথে তথ্যের সামঞ্জস্যতাকে। যেনো আগামীতে ঐ ব্যবহারকারী একই প্রতিষ্ঠানের হার্ডওয়্যার কিংবা সফটওয়্যার ব্যবহার না করেও নিজের প্রয়োজনীয় তথ্যটুকু পূর্নব্যবহার করতে সফল হন।

প্রযুক্তির দুনিয়ায় “আদর্শমান” সমূহের অপব্যবহার কি? যদি উপরোক্ত নীতিমালা বা আদর্শমান লংঘন করে কোন প্রতিষ্ঠান কোন পন্য তৈরী এবং বাজারজাত করে এবং সেটা ব্যবহারকারীদেরকে বাধ্যগত করে নতুন আসা প্রযুক্তিতে সমন্বয় কিংবা নতুন করে ব্যবহারে তো সেটাকেই সহজ ভাষায় আমরা বলবো — প্রযুক্তির দুনিয়ায় “আদর্শমান সমূহের অপব্যবহার”। আমার লেখার পরবর্তী অংশটুকু পড়বার আগে, নিজেকে অধিকতর তথ্যসমৃদ্ধ করে নিতে চাইলে পড়তে পারেন — http://www.gnu.org/philosophy/categories.html#ProprietarySoftware

“আদর্শমান” সমূহের অপব্যবহারের শীর্ষতালিকায় মাইক্রোসফটের নামটা সর্বোচ্চ অবস্থানে কেন? এটা জানতে চাইলে আসুন দেখি মাইক্রোসফট নিজের তৈরী পন্যের মাধ্যমে সে এ অবদি কি কি অ-কাজ/কু-কাজ/কুপ্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিলো এবং রয়েছে। আপনারা তো নিশ্চয়ই বর্তমান সময়ের ইন্টারনেটের দুনিয়া সম্পর্কে বেশ ভালোরকম অবগত আছেন। আচ্ছা বলুন তো দেখি বর্তমানে ইন্টারনেটের জগতে সবচাইতে জনপ্রিয় ওয়েব ব্রাউজার কি? আমি জানি যে, এ পশ্নের উত্তরে কেউ বলবেন গুগল ক্রোম আবার কেউ বা বলবেন ফায়ারফক্সের নাম। মজার বিষয় হচ্ছে ঠিক এই রকমই দুটো ব্রাউজার হলো সাফারী আর ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার। সাফারী আর গুগল ক্রোম এর এর জাতটা মোটামুটি একই রকম। এবং কার্যপ্রনালীও প্রায় একই ধরনের। তবে গুগল ক্রোম আর ফায়ারফক্স এ দুটো ব্রাউজারই কোন সফটওয়্যার বিক্রেতা বিক্রয় করার মতো ক্ষমতা রাখে না। সাফারী বিক্রয় করে থাকে অ্যাপল আর ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার বিপনন করে থাকে মাইক্রোসফট। তবে প্রাথমিক জনপ্রিয়তার পার্থক্যের জায়গাটুকু এই বিনামূল্যের কারনে নয়। মূল কারনটাই হলো সেই “আদর্শমান”, আর সেই মতে কোন ওয়েব ব্রাউজার কোন ক্রমেই মূল ওএসএর ফাইলসিস্টেমকে পড়ার কিংবা ওএস এর সাথে এমবেডেড হতে পারবে না। কেননা এতে করে কম্পিউটারে রক্ষিত গুরুত্বপূর্ন তথ্যের ক্ষতি সাধন হবার সম্ভবনা অনেক বেশী। অত্যন্ত গুরুত্বের বিষয় হলো একমাত্র ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারটাই এই দোষে দুষ্ট এবং ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার মূল ওএস এর সাথে এমবেডেড। কি রকম? সেটা তো আমার লেখার তৃতীয় পর্বে বলেইছিলাম। তবু আজকে আপনার চাক্ষুষ প্রমাণের জন্য আরেকটু বলি। আপনি যদি “খিড়কী” কিংবা “জানালা” ব্যবহারকারী হয়ে থাকেন তো আপনি আপনার পিসির মাইকম্পিউটার আইকনে ক্লিক করুন। যে উইন্ডো পেলেন তাতে অ্যাড্রেসবারে যে কোন ড্রাইভ লেটার লিখে কোলন চিহ্ন [:] দিয়ে এন্টার চাপুন। দেখবেন আপনার পিসির ঐ ড্রাইভটা ফাইল ব্রাউজারে প্রদর্শিত হয়ে গেছে। এবারে ঐ ঠিকানারবক্সটাতেই একটা ওয়েব ঠিকানা লিখুন। যেমন — http://www.google.com এবং এন্টার চাপুন। দেখবেন আপনার ফাইল ব্রাউজারটাই সংগে সংগে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারে পরিনত হয়ে গেলো এবং ঐ ওয়েব ঠিকানায় আপনাকে নিয়ে গেলো। ঠিক এই ক্রটিটুকুই মাইক্রোসফট তাঁর প্রতিটা “খিড়কী” সংস্করনের সাথে বজায় রেখে চলেছে এবং এ নিয়ে যতই আদর্শমানের অপব্যবহার হোক না কেন তা পাশ কাটাতে সে নানান ছলনার আশ্রয় অতীতে নিয়েছে, বর্তমানে নিচ্ছে এবং আগামীতেও নিতে সচেষ্ট থাকবে। আপনারা যাঁরা “সপ্তম জানালা” বা উইন্ডোজ সেভেন ব্যবহার করে থাকেন তাঁরা নিশ্চয়ই কখনো নিজ কম্পিউটারে ওএসটা ইন্সটল করার সময়ে কোন ব্রাউজার ব্যবহার করতে চান তা জানতে বা জানাতে চাইতে পারেন না? তবে এটা জেনে রাখুন যে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন ভুক্ত দেশগুলোতে মাইক্রোসফটকে এই একচেটিয়া ত্রুটিপূর্ন আচরন বারবার করতে দেয়া থেকে বর্তমানে রহিত করা হয়েছে এবং সেখানে এই “সপ্তম জানালা” পিসিতে ইন্সটল করার সময়েই মাইক্রোসফট কম্পিউটার ব্যবহারকারীর পছন্দানুযায়ী ওয়েব ব্রাউজার পছন্দ করে নেবার বার্তা দেখাতে বাধ্য। অন্যথায় ঐ বাজারে তাঁর পন্য চিরতরে নিষিদ্ধ হয়ে যাবে এবং বর্তমান পন্যগুলোর জন্য তাঁকে জরিমানা গুনতে হবে। ওয়েব ব্রাউজার নিয়ে মাইক্রোসফটের অনৈতিকতার কিছু আপডেট পাবেন এখানে — http://www.opera.com/press/releases/2007/12/13/

আসুন ওএস এর দুনিয়া ছেড়ে মাইক্রোসফটের অফিস প্যাকেজের পন্যের ঘোটলাগুলো একটু ঘাঁটিয়ে নিই। ওপেন অফিস এবং লিব্রে অফিস হলো মুক্ত অফিস প্যাকেজের প্রকৃষ্ট উদাহরন। যা বর্তমানের প্রায় সব প্রজাতির অপারেটিং সিস্টেমে চলতে সক্ষম। এই অফিস প্যাকেজগুলো নিজের নথিগুলোর তথ্যগুলো এক্সএমএল (XML) ফরম্যাটে সংরক্ষন করে থাকে এবং একটা ভার্সনে কিংবা একটা প্যাকেজে তৈরী করা নথি অপরটিতে অতি সহজেই পড়া যায় এবং সম্পাদনা করে প্রয়োজনটুকু মিটিয়ে নেয়া যায়। মাইক্রোসফটের অফিস সফটওয়্যারের ভেতরেও নথিগুলোর তথ্য সংরক্ষন এক্সএমএল ফরম্যাটেই করা হয় তবে সেটা “আদর্শমান” কে পাশ কাটিয়ে, মাইক্রোসফটের নিজস্ব পন্থায়। ফলে মাইক্রোসফটের অফিস ডকুমেন্টের মাইক্রোসফটেরই অন্য একটা অফিস প্যাকেজের সংস্করনের সাথে কাজ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে, অনেক ক্ষেত্রে নথিটি সম্পূর্নই পুরাতন এমএস অফিসে অকার্যকর হয়ে যায়। মাইক্রোসফট নিজের অফিস প্যাকেজে যে এক্সএমএল ফরম্যাটটা ব্যবহার করে তা উন্মুক্ত এবং অন্যদের জন্য ব্যবহার উপযোগী রাখাটা উন্নত দেশগুলোর সফটওয়্যার নীতিমালা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক। তবে এই বিষয়টাকে সে টেকনিক্যালি বেশ চমৎকারভাবে পাশ কাটাতে নিজের তৈরী এই “অনাদর্শিক” অফিস এক্সএমএল (OOXML) ফরম্যাটে ব্যবহারের জন্য যে সহায়িকা দিয়েছে তা প্রায় ৬০০০ (ছয় হাজার) পৃষ্ঠার, যা মাইক্রোসফট ব্যতীত অন্যদের জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহারকে জটিলতম করে তুলেছে। তদুপরি ওপেন ডকুমেন্টের আদর্শমানে তৈরী করা নথিপত্রগুলো এমএস অফিসে পড়া ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে জটিলতা সৃষ্টি করে থাকে মাইক্রোসফট। ফলে এখানেও মাইক্রোসফট নিজের ব্যবহারকারীদেরকে নিজের নতুন পন্যগুলোর দিকে প্ররোচিত এবং অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে থাকে, একই সাথে নিজের পন্য ব্যতীত সাধারন ব্যবহারকারীর জন্য পছন্দের বিষয়টাকে সম্পূর্নই অবহেলা করে থাকে। ওপেন ডকুমেন্ট এর “আদর্শমান” কে প্রভাবিত করতে মাইক্রোসফট বিভিন্ন কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে, এমনকি প্রযুক্তির জগতের “আদর্শমান” নির্ধারন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদেরকে ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে প্রভাবিত করতে ও চেষ্টা করেছে। এ বিষয়ে আরো অধিকতর জ্ঞানার্জনের জন্য পড়ে নিতে পারেন — http://www.marketwatch.com/story/story/print?guid=C0D943C4-4ADC-471C-8F87-9181A4EC3E7B

দুষ্ট গরু নাকি শুন্য গোয়াল ? !!! সাধারন কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের মতদ্বৈততার ঠিক এই অবস্থানটুকুর কারনেই মাইক্রোসফট নিজে কোন নতুন প্রযুক্তিতে গবেষণার পেছনে ব্যয় করে খুব কম। তার চাইতে ঐ অর্থের ব্যবহার করে যদি অন্য কারো প্রযুক্তির কার্বন কপি তৈরী করিয়ে/জবর-দখল করে এনে/কোনমতে একটা কিছু তৈরী করে সাধারন ব্যবহারকারীদেরকে চটকদার আর মনোলোভা বিজ্ঞাপনের ভেলকি দেখিয়ে বোকা বানানো যায় তো তাতে অতি অল্প সময়েই নিজের ভাঁড়ারে পয়সা আসবে ভালোই। ঠিক এমনি কিছু কাজা করে যাচ্ছে ইদানিংকার চাইনিজ মুঠোফোন প্রস্তুতকারকগণ। এতো সস্তায় এখন বাজারে মুঠোফোন সেট পাওয়া যাবে যে তা মনে হয় “মুড়ি খাইলে ঠোঙ্গা ফ্রী” এর মতো একটা ব্যাপার। তবে মাইক্রোসফট কিন্তু নিজের বিপননের হিসেবে বেশ কড়া এবং পন্য যাই হোক না কেন তাঁর ক্রেতা সৃষ্টি করতে সে কিন্তু শুধুই বিপনন ব্যবস্থার ওপরে ভরসা করে না। বরংচ তাঁর কিছু পোষা প্রানী, যাঁরা আমাদের মানব সমাজের বেশ উঁচু স্তরে আসীন এবং এঁদেরকে বেশ মনভোলানো খেতাব (এমএসপি, এমসিপি ইত্যাদি) দিয়ে, বিভিন্ন আয়োজনে পুরষ্কার ও নানান রকম উপহারের মাধ্যমে এমনকি নিজের কিছু যাচ্ছেতাই মানের পন্যের বিনামূল্যের স্বত্তঃপ্রদানের মাধ্যমে (ফ্রী অব কস্ট লাইসেন্সিং) নিজের পন্যের বিপননের পক্ষে কাজ করাতে ব্যবহার করে থাকে। আর এঁরাই কিছু বুঝুক চাই না বুঝুক, যে কোন প্রযুক্তি পন্যের বিষয়ে মাইক্রোসফটের পক্ষে দালালীটুকু ঠিকঠাক করে দিতে আত্মপ।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী যেভাবে একসময় আমাদেরকে এই ভারতীয় উপমহাদেশে এসে উন্নত জীবন, শিক্ষা, প্রগতি ইত্যাদির মনভোলানো কথায় সমাজের কিছু মানুষকে কব্জা করার মাধ্যমে জনসাধারনকে বাধ্য করেছিলো গোলামী করতে ঠিক একই পন্থা বেছে নিয়ে মাইক্রোসফট ও। তবে পার্থক্য এটুকুই যে ঐ সময়ের ভুলগুলো শুধরে নিতে আমাদের প্রায় দুইশত বছর আর প্রায় কোটিপ্রানের বিসর্জন দিতে হয়েছিলো আর বর্তমান সময়ে আমাদের শিক্ষিত সচেতন তরুন প্রযুক্তিবিদদের মাধ্যমে যে ভুল আমরা করেছি, করছি এবং করতে যাচ্ছি কোন ভালো-মন্দ যাচাই-বাছাই না করে, অন্ধের মতো পথ চলতে গিয়ে আর প্রকারান্তরে পড়ছি এই বেনিয়া প্রতিষ্ঠানের খপ্পরে তার সংশোধনী আমার পরবর্তী কতো প্রজন্ম পরে হবে তা সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন।

আমার বক্তব্য পরিষ্কার — হয় মাইক্রোসফট নিজের এই অনৈতিক আচরনগুলো থেকে সরে আসবে এবং ব্যবহারকারীদেরকে নিজের পছন্দানুযায়ী কাজকর্ম করার সুযোগটুকু করে দেবে অথবা আমি নিজেই নিজের কম্পিউটারে কাজের জন্য নিজের পছন্দের সফটওয়্যার সৃষ্টি করতে চেষ্টা চালাবো। আর এই চেষ্টার শুরু আজ আমিই করতে যাচ্ছি এমনটা নয়। আমার মতো এই রকম মুক্ত আর স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য প্রাথমিক কাজটুকু সহ একটা যৌক্তিক আর সুগঠিত অবস্থান তৈরী করে দিয়েছেন রিচার্ড স্টলম্যান (http://www.stallman.org), তাঁর Free Software Foundation বা মুক্ত সফটওয়্যার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে। সাথে ১৯৯১ সালে এই আন্দোলনে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে খুব কম সময়েই নতুন এই আলোকময় পথের কান্ডারীর ভূমিকায় অবতীর্ন হন লিনুস বেনেডিক্ট টরভ্যাল্ডস (http://en.wikipedia.org/wiki/Linus_Torvalds), যাঁকে আমরা সবাই জানি/চিনি “লিনুস” নামে এবং “লিনাক্স (Linux)” কার্নেলের জনক হিসেবে।

নিজেকে আরো সচেতন করে তুলতে, প্রযুক্তির বিষয়গুলোতে আপনার অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে এবং শুধুমাত্র অর্থের লিপ্সাকে চরিতার্থ না করেও কিভাবে জনসেবার মাধ্যমে জীবনধারন আর ব্যবসায়িক কুটিল মনোভাবের বদলে মহৎভাবের বিকাশে মানবতার উন্নতি সাধন করা সম্ভব সে নিয়ে আরো বিস্তারিত জানতে ঘুরে আসতে পারেন — http://www.fsf.org থেকে।

আমার নিজের জ্ঞান খুবই সীমিত তবে তাতে নিজের ভালো-মন্দ বিচারের যে ক্ষমতাটুকু মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমায় দিয়েছেন সেটুকুর ব্যবহার আর নিজ দ্বায়িত্ববোধেই আমাদের আগামী প্রজন্মের উদ্দেশ্যে কিছু সতর্কতা, কিছু সচেতনতা সৃষ্টির জন্যেই আমার এই লেখা। কবে, কখন, কার কতটুকু উপকার হবে তা জানি না। তবে আগামী প্রজন্মের জন্য আমার ছোট্ট এই প্রয়াস, যেনো সঠিক পথের শুরুর দিকের একটা আলোক নির্দেশিকা হয় সেই চেষ্টা চালাতে থাকবো।

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৬) প্রকাশিত হবে আগামী ২রা ফেব্রুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ১) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ২৯শে ডিসেম্বর ২০১১ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ২) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ৫ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৩) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ১২ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৪) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ১৯শে জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।

Advertisements
Posted in খেয়াল করুন, জেনে রাখুন, দেশ ও জাতির প্রতি দ্বায়বদ্ধতা, ভালো লাগা, ভালোবাসা

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৪)


তারিখ: ১৯শে-জানুয়ারী-২০১২ইং

অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে “উইন্ডোজ” অপারেটিং সিস্টেম কে আমি “খিড়কী” বা “জানালা” নামে ডাকতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। আমার এ লেখায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি লেখাটা পড়ে আহত হোন বা কষ্ট পেয়ে থাকেন তো সেইজন্যে আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। কিন্তু করার ও তো কিছু নেই। আমার লেখায় যদি আমিই শান্তি না পাই তো লিখবো কি করে‍‍? এই কাজটুকু করাই হতো না যদি না “প্রজন্ম ফোরাম” আর “উবুন্টু বাংলাদেশ” এর মেইলিং লিস্টে কিছু মানুষের ভুল ধারনা কে ভেঙ্গে দিতে কিছু কঠিন মন্তব্য না করতাম আর সেখানে আমাদের গৌতম দা আমাকে এই বিষয়ে বিশদভাবে লেখার জন্য উৎসাহ না দিতেন। গৌতম রয় কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার ভেতরের আমি কে টেনে-হেঁচড়ে বের করে নিয়ে আসবার জন্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটি আমি পর্ব আকারে বিগত ২৯শে ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী প্রতিটি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে প্রকাশ করছি এবং করবো ইনশাল্লাহ। আজ প্রকাশিত হলো চতুর্থ পর্ব। অষ্টম পর্বে লেখার উপসংহার প্রকাশ করার ইচ্ছে রয়েছে। আপনার আগ্রহ থাকলে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বের লেখাগুলো একটু সময় করে পড়ে নিতে পারেন।

আজকের লেখায় আমি, ৪। ব্যক্তি স্বাধীনতায় পরিপন্থী অনৈতিক বাধ্যগতকরণ (Lock-in) বিষয়ে অতি সহজ ভাষায় কিছু কথা বলতে চেষ্টা করেছি। আশা করি এ বিষয়ে আপনাদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হবো।

যুদ্ধ, নাকি মহড়া? প্রতি বছর প্রতিটা দেশের সশস্ত্রবাহিনীর কমপক্ষে একটি যুদ্ধকালীন মহড়া হয় — এ বিষয়টা তো নিশ্চয়ই সবাই মোটামুটি জানেন? আমার প্রশ্ন হলো এই যে মহড়া তাতে কি জনতা/জনসাধারন কে ইচ্ছেকৃতভাবে মেরে ফেলা কিংবা অত্যাচার করা হয়? নাকি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আমাদের সেনা/নৌ/বিমানবাহিনী কতটুকু সক্ষম তা বুঝতে সত্যি সত্যিই কোন যুদ্ধ লাগিয়ে দিতে হয় দেশের কোন একটা অংশে? সবাই নিশ্চয়ই এইটুকুতে একমত হবেন যে এই ধরনের মহড়ায় অংশ নেবার জন্য আসলে সশস্ত্র বাহিনীরই একটা অংশ কে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে যুদ্ধের (একটা নাটক) আবহ সৃষ্টি করে তা উপস্থাপন করা হয়।

এই মহড়াগুলোতে বিমানবাহিনী যখন বিপক্ষ শিবিরের কোন লক্ষ্যে বোমা/গোলা/গুলিবর্ষন করে তো তাঁর আগে লক্ষ্যবস্তুটাকে চিহ্নিত এবং স্থির করে থাকে। যদি সেটা বিমান বা চলমান কোন বস্তু হয় তো? তবে সেটাকেও একইভাবে নিজের গুলি/মিসাইলের সীমায় এনে লক্ষ্যস্থির করে নেয় বিমানসেনারা। এই লক্ষ্যস্থির করা বা লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত হানবার আগে নিয়মিত নজরে রাখার প্রযুক্তিটিকেই বলা হয়ে থাকে লক-ইন (Lock-in)। এরমানে হলো লক্ষ্যবস্তু একবার লকইন হবার পরে যদি ভৌগলিক অবস্থানের পরিবর্তনও হয় তো সমস্যা নাই, বিমান থেকে ছোঁড়া বোমা/মিসাইল লক্ষ্যবস্তুকে ঠিকঠাক আঘাত হানতে পারবে।

লেখার শুরুটা পড়েই এতক্ষনে আপনাদের মনে হয়তোবা সন্দেহের দানাবাঁধতে শুরু করে দিয়েছে যে, লেখক সম্ভব মিলিটারী বা প্যারামিলিটারী ফোর্স নিয়ে বেশ জমাটজমাট কিছু লিখবেন। ভয়ের কিচ্ছু নেই আমি আপনাদেরকে আশ্বস্ত করছি এই লেখা কোন সামরিক কোন বিষয়বস্তু নিয়ে নয় বরংচ আমাদের দৈনন্দিন প্রযুক্তি জীবনে একটি প্রতিষ্ঠান কিভাবে আমাদেরকে নিজের সফটওয়্যারের মাধ্যমে ”বাধ্যগত এবং নজরবন্দী” (লকইন) করে রেখেছে তাই ধীরে ধীরে আপনাদের সামনে উন্মোচন করতে চেষ্টা করবো। তো আসুন, দেরী না করে শুরু করা যাক? আচ্ছা ঠিক আছে, মূল লেখায় যাবার আগে ছোট্ট একটা কুইজ করি আপনাদের জন্য। পুরষ্কার হিসেবে পরের লেখাটুকু দিলাম। এবারে একটু হাসুন। 🙂

বলুন দেখি ??
১. ধরুন আপনি উইন্ডোজ এক্সপি’র লাইসেন্সকৃত কপি ব্যবহার করে থাকেন। তো বর্তমানে আপনার এক্সপি সিস্টেমে কোন হার্ডওয়্যারের সাপোর্টে সমস্যা হচ্ছে এবং আপনি এই বিষয়ে মাইক্রোসফটের দ্বারস্থ হলেন, যেহেতু আপনি তাঁদের একজন গুরুত্বপূর্ন গ্রাহক। তাঁরা আপনাকে এই এক্সপি সিস্টেমে হার্ডওয়্যারটুকু সাপোর্ট করাবার বিষয়ে কি সেবা দেবে?

২. আপনি অনলাইনে নিয়মিত থাকেন আপনার এক্সপি/ভিসতা সিস্টেম ব্যবহার করে। প্রতিবারই নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে আপনি সিস্টেম আপডেট বললেই কিছু জিনিষ ডাউনলোড এবং ইন্সটল হয়ে যায়। কোথায় নামলো? আপডেট হিসেবে কি কি আপনার কম্পিউটারে নামলো? আপডেটগুলো আপনার জন্য কিভাবে উপকারী/অপকারী এই বিষয়গুলোতে কোন তথ্য কি আপনি জানেন/আদৌ জানানো হয় আপনাকে?

৩. এক্সপি চালাতে গেলে আপনার সিস্টেমে ৫১২ মে.বা মেমরী বা RAM থাকলে ভালো হয়, ভিসতা চালাতে গেলে সেটা ১জি.বি আর সেভেন চালাতে গেলে ১জি.বি’র নীচে কিছু হলে চলবেই না। আচ্ছা বলুন তো আপনি এভাবে প্রতিবারে নতুন ওএস লোড করতে গিয়ে কত টাকার নতুন হার্ডওয়্যার কিনেছেন/কিনতে বাধ্য হয়েছেন? ব্যয়িত অর্থগুলোর সদ্ব্যবহার করতে পেরেছেন কি? নাকি তাঁর আগেই আবারো আপগ্রেডের ঝামেলায় পড়েছেন?

৪. আচ্ছা বলুন তো দেখি এমএস অফিসের বর্তমান সংস্করনের আদর্শমানে তৈরী করা নথিপত্র আপনারই পূর্বে লাইসেন্সকৃত কোন একটি এমএস অফিসের সংস্করনে চালাতে গেলে কতটা ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়?

৫. এমএস অফিস বাদ দিয়ে আপনি যদি অন্য কোন অফিস স্যুইট আপনার “খিড়কী” সিস্টেমে ব্যবহার করেন তো সেক্ষেত্রে সিস্টেমের পারফরমেন্স কি কিছুটা কমে যায়/স্লো মনে হয়?

৬. আপনার বর্তমান সফটওয়্যারটির (এমএস উইন্ডোজ/অফিস) লাইসেন্স কি বিনামূল্যেই নতুন সংস্করনের সফটওয়্যারে আপনাকে আপগ্রেড করতে দেয়?

ওপরের ছয়টি প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলে উপহার/পুরষ্কার হিসেবে এখন নিচের লেখাটুকু পড়তে শুরু করুন।

মাইক্রোসফটের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের অংগরাজ্যগুলো এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সুরক্ষা বিভাগের সেই ঐতিহাসিক মামলাটার নাম মনে আছে তো আপনার? “এন্টিট্রাস্ট মামলা”। এই মামলায় জড়িয়ে পড়বার আগে মাইক্রোসফটের যে বিপনন ব্যবস্থা তাঁর মূলনীতি ছিলো সেই বিখ্যাত তিনটে E, যথাক্রমে Embrace, Extend and Extinguish। মামলা চলাকালীন ইন্টেলের ভাইসপ্রেসিডেন্ট স্টিভেন ম্যাকগেডি এই বিষয়টা নিশ্চিত করেন এবং সাক্ষ্য দেন যে, “মাইক্রোসফটের ভাইসপ্রেসিডেন্ট পল মারিটজ এটা উল্লেখ করেছিলেন ইন্টারনেট, জাভা এবং নেটস্কেপ বিষয়ে মাইক্রোসফটের কর্মপরিকল্পনাটুকু ইন্টেল কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার সময়ে।” এখানে যে Embrace বা কাছে টানা বা জড়িয়ে ধরা বা বন্ধনে আবদ্ধ করা, তারপরে Extend বা প্রসারিত করা বা টেনে লম্বা করা এবং তারপরে Extinguish বা বন্ধ করা বা থামিয়ে দেবার কথা উল্লেখ করা হয়েছে আসুন তাঁর বাস্তব চিত্রটা একটু দেখে নিই।

মাইক্রোসফটের এই ‘E’ত্রয়ী সম্পর্কের বাঁধনে জড়িয়ে ছিলো নোভেল, আসুস এবং ইন্টেলের মতো বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। এবং ফলাফল স্বরুপ আসুসের ঐ চুক্তির পরেই আসুসের EEE PC এর লভ্যাংশের ৯৪ শতাংশই হারিয়ে বসে। কিভাবে সেটা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। আর চুড়ান্ত মার তো খায় সাধারন ব্যবহারকারীরা। কেননা আসুসের এই পিসিগুলোর সাথে বান্ডেলড অবস্থায় আসতে শুরু করে “খিড়কী” আর ব্যবহারকারী নিজে না চাইলেও ব্যবহারে/অভ্যস্ত হতে বাধ্য হয় সেই সিস্টেমেই। একইভাবে নোভেলের সাথে চুক্তি করার পর নোভেলের ভিএমওয়্যার ব্যবসায়ে মার খেতে শুরু করে আর আজ মাইক্রোসফটের ভার্চুয়ালাইজেশন টেকনোলজি ক্রমশ ব্যবসায়িক পন্য হয়ে উঠছে। ফলাফলে কি হলো এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মাইক্রোসফট একদিকে যেমন তাঁদের বাতিল করে দেয়া পন্য (জানালা এক্সপি) বিপনন করলো একই সাথে ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক লভ্যাংশে ভাগ বসালো। উপরস্তু ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন ক্ষতির দায়ভারও নিলো না। তারমানে এই ‘E’ত্রয়ী হলো “বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে, দমআটকে স্তব্ধ করে দেবার” একটা শর্তভান্ডার। এরকম আরো কিছু ঘটনা আছে মাইক্রোসফটের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর। আরো বিস্তারিত জানতে চাইলে পড়ে নিতে পারেন —
১। http://en.wikipedia.org/wiki/Embrace,_extend_and_extinguish
২। http://techrights.org/2009/07/27/antimonopoly-service-steps-in
৩। http://techrights.org/2009/04/24/microsoft-pays-asus-claim
৪। http://techrights.org/2009/06/04/microsoft-embracing-extending-netbooks
৫। http://techrights.org/2009/05/06/asustek-falls-with-windows
৬। http://www.zdnet.com/blog/microsoft/microsoft-hits-back-on-expanded-novell-vmware-alliance/6509

আর চুড়ান্তভাবে এই মাইক্রোসফটের এই লক্ষ্যবস্তুর শিকার হলো কিন্তু শুধুমাত্রই ঐ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো নয়। কারা বলুন তো? ধরতে পারছেন নিশ্চয়ই? হ্যাঁ আমরা এই সাধারন ব্যবহারকারীরাই হলাম সেই “লক্ষ্যবস্তু” যা কি না মাইক্রোসফটের নজরে বন্দী হয়ে গেলাম। এখন তো আরো বড়ো খটকা বেঁধে গেলো মনে, তাই না???

কিভাবে হলাম আমরা মাইক্রোসফটের “বিপনন মিসাইলের” সেই সুনির্দিষ্ট “লক্ষ্যবস্তু”?!!! এই জন্যেই আমার এই লেখার শিরোনাম আমি দিয়েছি — “বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে”। আচ্ছা খেয়াল করে দেখুন তো আপনার জন্য আজকের কুইজের প্রথম প্রশ্নটা কি ছিলো। আর তার উত্তরে আপনি কি জবাব পেয়েছিলেন? বেশ আপনার মনের সাথে আমার কথা(লেখা)টুকু মিলিয়ে নিন। উত্তরটা ছিলো মাইক্রোসফট খুব সুন্দর করে আপনাকে মেইল দিয়ে জানাবে যে তাঁদের বর্তমান প্রযুক্তিতে আপনি চলে আসুন, সপ্তম জানালা (উইন্ডোজ সেভেন) ব্যবহার করা শুরু করুন। কেননা এক্সপি এর সবরকম বিপনন আর আপডেট প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মাইক্রোসফট ইতোমধ্যেই বন্ধ করে দিয়েছে এবং সে আর আপনাকে এই সংক্রান্ত কোন সহায়তা আর দেবে না। মানে সহজ ভাষায় বিগত দুই/তিন/পাঁচ বছরের জন্য আপনি তাঁদের পন্যের ক্রেতা ছিলেন। যদি আর কোন নতুন পন্য আপনি না কেনেন তো আপনাকে আর কোনরকম সহায়তা সে দেবে না। একবার চিন্তা করুন তো এই “খেল খতম, পয়সা হজম” টাইপের আচরন যদি আপনার পাড়ার মুদি দোকানদার করে তো আপনি তাঁর চেহারার ভৌগলিকতায় কি কি পরিবর্তন আনতে পারেন? কিন্তু আফসোস! মাইক্রোসফটের চুলটিও আপনি ছুঁতে পারবেন না। কেননা পন্য বিক্রয়ের সময় তাঁর চুক্তিপত্রেই সে স্পষ্ট লিখে রেখেছে যে ঐ সফটওয়্যার আপনি সম্পূর্ন নিজ দ্বায়িত্বে কিনছেন এবং এটার কারনে আপনার কোন সমস্যা হলে সেটা নিয়ে মাইক্রোসফটের কোন দায়বদ্ধতা নেই। তবে হ্যাঁ এই বিষয়ে দায়বদ্ধতা না থাকলেও নিজের নতুন পন্য আপনাকে কিনতে বাধ্য করার জন্য আপনার লাইসেন্সকৃত সফটওয়্যারটি আপনাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে বাধ্য করার মতো বাধ্যবাধকতা সে সম্পূর্নই নির্দ্বিধায় এবং হৃষ্টচিত্তে পালনে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। 🙂

এইটুকুতে মাইক্রোসফট যদি থেমে থাকতো তো চলতো। “বকরী হালাল” করার আগে যেভাবে কষাই তাকে প্রচুর পানি খাওয়ায় ঠিক তেমনি আপনার জন্য মাইক্রোসফট নিজের নতুন পন্যের বিভিন্ন সুবিধা তুলে ধরে বিজ্ঞাপন দেয়। একই সাথে পুরোনো প্রযুক্তির সর্বশেষ প্যাচ/আপডেট বলে একটা কিছু অনলাইনে ছেড়ে দেয় যেটাতে প্রচুর বাগ বা সমস্যা বা ত্রুটি থাকে। ফলে আপনার স্ট্যাবল সিস্টেম আনস্টেবল হয় আর আপনি যখন সাপোর্টের জন্য মাইক্রোসফটকে বলেন তো সে আপনাকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে ঠিক ঐ জায়গাতেই নিয়ে আসে যেনো আপনি নতুন পন্যটা কেনেন। ছোট্ট একটা উদাহরন দিই — এক্সপি’র সার্ভিস প্যাক টু ছাড়া হয়েছিলো সার্ভিস প্যাক ওয়ানের কিছু বাগ ফিক্স করতে। কিন্তু দেখা গেলো সার্ভিস প্যাক ২ ইন্সটল করার পরপর সিস্টেম আগের চাইতে ধীরগতির হয়ে পড়েছে। উপায়ান্তর না দেখে যদি সাপোর্টের জন্য যোগাযোগ করা হয়েছে তো অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে, দ্রুতই সমস্যাটা সমাধিত হবে। কিন্তু আসলে দেখা গেলো এর ফাঁকেই ভিস্তা চলে আসলো। তখন বলা হলো ভিস্তায় আপগ্রেড করতে, তাহলেই সমস্যার সমাধান নিমিষেই। কিন্তু এই নিমিষের সমাধান হাতে পেতে গেলে যে শুধু সফটওয়্যার কিনলেই হবে এমনটা নয়। কিনতে হবে কিছু নতুন হার্ডওয়্যারও। কেননা এক্সপি এর চাইতে ভিস্তার সিস্টেম রিকয়ারমেন্ট অনেক বেশী।

ভালো কথা, হার্ডওয়্যারের বিষয়ে যখন চলেই আসলাম তো আসুন ফিরে দেখি একটু পেছনে। আপনার এক্সপি মেশিনের হার্ডওয়্যারগুলো আপগ্রেড করতে হলো ভিস্তা চালানোর জন্য। তাহলে আগের প্রসেসর, মেমরী, হার্ডডিস্ক, মাদারবোর্ড এগুলো কি করবেন? হুমম!!! উপায় হলো — হয় সেগুলো ভাগাড়ে ফেলে দিন নয়তো আগের সিস্টেম নিয়েই জোর করে সন্তুষ্ট থাকতে চেষ্টা চালান। এই যে দুমদাম নষ্ট বা অচল না হওয়া স্বত্ত্বেও একটা হার্ডওয়্যার আপনাকে ডাম্প বা অব্যবহার্য করতে বাধ্য করা হচ্ছে এটা কি অপরাধ নয়? এটা কি বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় নয়? এটা কি অর্থনীতির উপরে অনৈতিক উপায়ে চাপ সৃষ্টি করা নয়? আরো বিস্তারিত জানতে — http://www.google.com/search?q=microsoft+forced+upgrade আর যাচাই বাছাই করার জন্য http://ur1.ca/ctsi এটা আপনাকে যথেষ্ট সহায়তা করবে। 😉

এডোবি’র মতো প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের ডিআরএম প্রযুক্তির ব্যবহার করে ফ্লাশ প্লেয়ারটা আপডেট করতে ব্যবহারকারীকে একরকম বাধ্য করে। তা নাহলে আপনি ওয়েব থেকে ব্রাউজারে ফ্লাশ ভিডিওগুলো চালাতেই পারবেন না। আর সেই ছুঁতোয় আপনার সিস্টেমের সব রকম মিডিয়ার তথ্য সে পড়ে নেয়। এটা কি আপনার ব্যক্তিতথ্য সবার সামনে উন্মুক্ত করতে আপনাকে ”বাধ্যগত এবং নজরবন্দী” (লক-ইন) করা নয়?

মাইক্রোসফটের “খিড়কী”র প্রতিটা সংস্করনে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন ত্রুটি রেখে দেয়া হয় যেনো সেগুলোকে ব্যবহার করে ক্র্যাকাররা বিভিন্ন কোম্পানীর তথ্য চুরি/ক্ষতিসাধন করতে পারেন। এবং এ ধরনের বিষয়ে চুক্তিপত্র (EULA) তে নিজের দায়টুকু এড়িয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে একটা প্রতিষ্ঠান কিংবা সাধারন ব্যবহারকারী বাধ্য হন বিভিন্ন অ্যান্টিভাইরাস, ম্যালওয়্যার প্রটেক্টর সফটওয়্যার কিনতে। আবার ঐ সফটওয়্যার গুলোও আপনাকে বছরে বছরে লাইসেন্স রিনিউ করে চালিয়ে যেতে হবে। এটা কি আপনাকে ”বাধ্যগত এবং নজরবন্দী” (লক-ইন) করা নয়?

তাহলে চুড়ান্তভাবে যদি সবকিছুকে একত্রে বিবেচনা করি তো কি পাচ্ছি আমরা? আমরা কি এটা দেখতে পাচ্ছি না যে, মাইক্রোসফট তাঁর ক্রেতাদেরকে নিজের স্বেচ্ছাচারীতার জালে আটকে নিয়েছে? যদিও বা ক্রেতা কোন একটা পথ খুঁজে নতুন করে কিছু একটা করতে চেষ্টা করে তো সে রাস্তা যেভাবে হোক মাইক্রোসফট বন্ধ করে দেবে। যেখানেই যান, যাই করুন, প্রযুক্তির জগতে থাকলে মাইক্রোসফট ছাড়া আর কোন গতি মিলবে না এমন বিশ্বাস নিয়েই আগামীর প্রজন্মের পথে বাধা সৃষ্টি করে দাঁড়াচ্ছে?

“আপনার বাঁশ আপনি নিন। বাঁশ মার্কায় ভোট দিন।” মাইক্রোসফট তাঁর পন্যের ক্রেতাদের সাথে যে চুক্তিপত্রের ভিত্তিতে আবদ্ধ থাকে (EULA) সেটাতে একটু ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিন। এটা পেয়ে যাবেন মাইক্রোসফটের প্রতিটা পন্যের সাথেই। তারপরেও একটা লিংক দিয়ে দিলাম — http://en.wikipedia.org/wiki/End-user_license_agreement। দেখে নিন। স্পষ্টতই বুঝে যাবেন কেন লিখলাম এই কথা। অবশ্য তুলনা করতে হলে আপনাকে জিপিএল লাইসেন্স বা মুক্ত সফটওয়্যারের নীতিমালাগুলোও একবার দেখতে হবে। এটা পাবেন — http://en.wikipedia.org/wiki/Free_software_license। এ দুটোর প্রধান পার্থক্য একটাই — মুক্তি বা স্বাধীনতা। মুক্ত সফটওয়্যার আপনাকে দেবে মুক্ত আর স্বাধীনভাবে আপনার কম্পিউটিং অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ আর সেখানে মাইক্রোসফট তেল ছাড়াই, আপনারই পয়সা দিয়ে কিনিয়ে নিয়ে, গাঁইটযুক্ত . . আপনার . . প্রযুক্ত করে দেবে। আগে তো ডাইক্লোফেনাক সাপোজিটরী ব্যবহারে ব্যথা মুক্ত হোন, তারপরে না হয় মুক্ত আর স্বাধীনতার বিষয়টাতে মাথা মারবেন।

আমি নিজে এই ব্যথামুক্ত, স্বাধীন দুনিয়ার বাসিন্দা বিগত প্রায় একযুগ যাবৎ (ব্যক্তিগত এবং কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার)। আর তাই সবাইকে এই আনন্দময়, মুক্ত ও স্বাধীন দুনিয়ায় আহ্বান জানাতে আর মাইক্রোসফটের বিভিন্ন কুটকৌশল নিয়ে সাধারন কম্পিউটার ব্যবহারকারীদেরকে সচেতন করে তুলতেই আমি এই লেখাটা লিখতে শুরু করেছিলাম। বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৫) প্রকাশিত হবে আগামী ২৬শে জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ১) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ২৯শে ডিসেম্বর ২০১১ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ২) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ৫ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৩) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ১২ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।

Posted in খেয়াল করুন, জেনে রাখুন, দেশ ও জাতির প্রতি দ্বায়বদ্ধতা, ভালো লাগা, ভালোবাসা

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৩)


তারিখ: ১২ই-জানুয়ারী-২০১২ইং

অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে “উইন্ডোজ” অপারেটিং সিস্টেম কে আমি “খিড়কী” বা “জানালা” নামে ডাকতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। আমার এ লেখায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি লেখাটা পড়ে আহত হোন বা কষ্ট পেয়ে থাকেন তো সেইজন্যে আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। কিন্তু করার ও তো কিছু নেই। আমার লেখায় যদি আমিই শান্তি না পাই তো লিখবো কি করে‍‍? এই কাজটুকু করাই হতো না যদি না “প্রজন্ম ফোরাম” আর “উবুন্টু বাংলাদেশ” এর মেইলিং লিস্টে কিছু মানুষের ভুল ধারনা কে ভেঙ্গে দিতে কিছু কঠিন মন্তব্য না করতাম আর সেখানে আমাদের গৌতম দা আমাকে এই বিষয়ে বিশদভাবে লেখার জন্য উৎসাহ না দিতেন। গৌতম রয় কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার ভেতরের আমি কে টেনে-হেঁচড়ে বের করে নিয়ে আসবার জন্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটি আমি পর্ব আকারে বিগত ২৯শে ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী প্রতিটি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে প্রকাশ করছি এবং করবো ইনশাল্লাহ। আজ প্রকাশিত হলো তৃতীয় পর্ব। অষ্টম পর্বে লেখার উপসংহার প্রকাশ করার ইচ্ছে রয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব আপনার আগ্রহ থাকলে পড়ে নিতে পারেন।

শারীরিক অসুস্থতার কারনে আমার আজকের লেখাটুকুর মান খারাপ হতে পারে। পাঠকগণ নিজগুনে ক্ষমা করলে আগামীতে আরো কিছু লেখার ভরসা পাবো।

আজকের লেখায় আমি, ৩। একচেটিয়া ব্যবসার লক্ষ্যে অনৈতিক আচরন (Monopoly Behavior) বিষয়ে আলোকপাত করতে চেষ্টা করেছি।

দখল? বেদখল?? নাকি জবর দখল!!! পন্য ক্রয়-বিক্রয়ের বাজারে পৃথিবীর সব বিক্রেতাই চাইতে পারেন তাঁর পন্য ছড়িয়ে যাক, সবার নজর কাড়ুক আর সবাই সেই পন্যকে ভালোবেসে/পছন্দের সাথে/মানসম্পন্ন পন্য হিসেবে জেনে ব্যবহার করুক। এই ইচ্ছেটা অনৈতিক কোন কিছু নয়। কিন্তু যদি ইচ্ছেটা হয় এরকম যে, “আমার পন্য হবে বিশ্বের একমাত্র পন্য যা মানুষ বুঝে/না বুঝে, জেনে/না জেনে, গুনগত মান যাচাই না করেই ব্যবহার করবে এবং করতে বাধ্য হবে।” তাহলে এই চাওয়াটা কে আপনি কি বলবেন? নৈতিক, না অনৈতিক? আমার হিসেবে দ্বিতীয় ইচ্ছেটা সম্পূর্নই অনৈতিক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ।

কেন বললাম এমনটা? !!! যদি এখনো বিষয়টা নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার না হয়ে থাকে তো জেনে নিন সৃষ্টির আদি থেকে একজন মানুষের মৌলিক অধিকার গুলো কি কি? ১) খাদ্য, ২) পানি, ৩) পরিধেয় বা বস্ত্র, ৪) বাসস্থান, ৫) চিকিৎসা ও ৬) শিক্ষা। এই অধিকারগুলোর প্রতিটার সাথে জড়িয়ে রয়েছে একজন মানুষের অস্তিত্ব, সমগ্র মানবজাতির ভূত-ভবিষ্যৎ। আপনি হয়তোবা আমার কথার আগামাথা এখনো অবদি ঠিক বুঝে উঠতে পারেন নাই। একটু কষ্ট করে পড়তে থাকুন, বুঝে যাবেন। মানুষের এই অধিকার গুলো রহিত করে দেয়া সম্ভব যদি তাঁকে বিরত রাখা সম্ভব হয় এমন একটি জ্ঞান বা বোধ থেকে যে, “আসলে তাঁর প্রাপ্য কতটুকু?”

মাইক্রোসফট ঠিক এমনটাই অতীত সময়ে সাধারন কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের সাথে করেছে, এখনো করছে, আগামীতে আরো ভয়ংকররূপে আরো ভয়াবহ কিছু করতে চাইছে।

কিভাবে সম্ভব? সব পাবলিকরে কি বলদ পাইছে??? যত্তসব ফালতু . . . !!! আমি মোটামুটি নিশ্চিত আমার আজকের লেখার উপরের দুটো অনুচ্ছেদ পড়ে এই অবদি আসার সময়ে আপনার মনের প্রতিক্রিয়া এই অনুচ্ছেদের শুরুর বাক্যটার মতোই। তবে এখন যে প্রমাণগুলো আপনার সামনে পেশ করবো একটার পর একটা তাতে করে লেখাটা পড়ে শেষ করার পর যদি নিজেকে এর চাইতেও খারাপ পর্যায়ের কোন প্রানী কিংবা অনুজীব বলে মনে হয় আর প্রতিক্রিয়ায় হাতের কাছে যা পান তা ছুঁড়ে মারার অভ্যাস যদি থেকে থাকে তো সাবধান হোন। পারলে লেখার পরবর্তী অংশে একটা করে অনুচ্ছেদ পড়বেন আর তারপর পড়া বন্ধ করে উঠে গিয়ে পানি খেয়ে আসবেন। তারপর কিছুক্ষন নিজেকে শান্ত করে নেবেন এবং পরবর্তী অংশ পড়বেন।

ভাবুন দেখি? এই অংশে কতগুলো প্রশ্ন থাকছে কম্পিউটার জীবনের সর্বপ্রথমে গ্রাফিক্যাল অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে “উইন্ডোজ” বা “খিড়কী” ব্যবহারকারী আমজনতার জন্য। আসুন, দেখে নিই এই “আমজনতা” নিজেরা কতটুকু সচেতন?
১. আপনার ব্যবহৃত প্রথম ওয়েব ব্রাউজার কোনটি? এটা কি “খিড়কী”র সাথেই দেয়া ছিলো?
২. বর্তমানে আপনি কোন ব্রাউজার ব্যবহার করেন? কেন?
৩. বর্তমানের ব্যবহৃত ব্রাউজারটার বিষয়ে আপনি কিভাবে জানতে পেরেছেন?
৪. আপনার ব্যবহৃত প্রথম অফিস প্যাকেজ কোনটি? এটা কি বিনামূল্যের ছিলো?
৫. বর্তমানে আপনার ব্যবহৃত অফিস প্যাকেজ কোনটি? এটা কি আপনার নিজের ইচ্ছেয় আপনার কম্পিউটারে ইন্সটল করেছেন? নাকি কর্মক্ষেত্রের অন্য সবার সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্যই কাজটা করা?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে আমার লেখার অধিকাংশ পাঠকের ভাবনায় যেগুলো আসবে তা আমি নিচে উত্তরমালা হিসেবে দিয়ে দিলাম। মিলিয়ে নিন। 🙂
উত্তর ১. ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার। হুমম! দেয়া ছিলো। ডেস্কটপেই তো শর্টকার্ট/লিংক দেয়া ছিলো।
উত্তর ২. অপেরা/ফায়ারফক্স। গতি এবং নিরাপত্তা। অনেক আনওয়ান্টেড পপ-আপ আর অ্যাড থেকে বেঁচে নিজের কাজটুকু শান্তিমতো করে নিতে পারি।
উত্তর ৩. আমার এক পরিচিত জানিয়েছিলেন। উনি নিজের ব্যবহার অভিজ্ঞতায় আমাকে এই বিষয়ে উৎসাহিত করেছিলেন।
উত্তর ৪. মাইক্রোসফট অফিস ৯৭/২০০০/এক্সপি/২০০৭/২০১০। না এটা বিনামূল্যের ছিলো না। আমি ৪০/৫০/৬০ টাকায় ডিভিডিতে কম্পিউটার দোকান থেকে কিনেছিলাম/কম্পিউটারের দোকান থেকেই কম্পিউটারটা ক্রয় করার সময় দিয়ে দিয়েছিলো।
উত্তর ৫. মাইক্রোসফট অফিস ২০১০। ভূতে কিলায় নাকি??? যে শখ করে একটা প্যাকেজের শেখা কাজের হাতের দক্ষতাটুকু নষ্ট করে নতুন প্যাকেজে আপগ্রেড করবো? ঠেলায় পড়লে বাঘেও ঘাস খায়, আর আমি তো . . .

এবারে পড়া বন্ধ করুন এবং মনিটরের সামনে থেকে উঠে যান। আমি বুঝতে পারছি আপনার কপালে চিকন ঘাম দেখা দিয়েছে এবং আপনি মোটামুটি দুই চোখের ভুরু কপাল কুঁচকে এক করে ফেলেছেন। কোন একটা অজানা আশংকা আপনার মনে দানা বাঁধছে এবং আপনি লেখার এই পর্যায়ে এসে হুট করেই আমার এই সিরিজের ১ম পর্ব এবং ২য় পর্বের লিংক হাতড়াচ্ছেন। চিন্তার কোন কারন নাই লিংক এই লেখার একেবারে শেষে পেয়ে যাবেন। তবে আপাতত নিজেকে শান্ত করুন। (দশ মিনিটের বিরতি) . . .

আসুন এবারে একটু অন্যরকমের কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হই —
১. আপনি কি কখনো ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার কে সিস্টেম থেকে আনইন্সটল/রিমুভ করেছেন? করতে চেষ্টা করেছেন?
২. উদ্যোগে পূর্নাঙ্গরূপে সফল হয়েছেন?
৩. বর্তমান এমএসঅফিস ২০১০ এর পূর্বনির্ধারিত আদর্শমানে সৃষ্টি করা যে কোন কাজ/নথি পূর্বের অফিস এক্সপি/ অফিস ২০০০ এ নিয়ে পড়া কিংবা কোন কাজ করতে পেরেছেন?

উত্তরমালাঃ (আপনার ধারনার সাথে মিলে গেলে তা সম্পূর্ন বকতালীয় :D)
উত্তর ১. হুমম!! চেষ্টা করেছিলাম। মোটামুটি সিস্টেমটা বেশ দ্রুতগতির হয় এতে।
উত্তর ২. আরে ধুর! তা হয় নাকি? পুরোপুরি মুছে যায় দেখায়। কিন্তু যদি কখনো Adress Bar এ কোন রকমের ওয়েব এড্রেস লেখা হয়ে যায় তো দুম করেই ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার চালু করার চেষ্টা করতে থাকে।
উত্তর ৩. দিলেন তো দিলে দাগা!!! এই ঝামেলার জন্যেই তো এই নতুন অফিস প্যাকেজের ব্যবহার করতে হচ্ছে। বাইরের থেকে কতোজনে মেইলে ডকুমেন্ট পাঠায় নতুন এডিশনে আমি পুরোনোটা ব্যবহার করি বলে গালমন্দ শুনতে হয়। তাই কষ্ট করে হলেও এখন নতুনটাতেই থাকতে হচ্ছে।

এই ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার সহ আরো কিছু কুটমতলব আর ব্যবসায়িক ধান্দাবাজির কারনেই মাইক্রোসফটকে ১৯৯৮ সালে এন্টিট্রাস্ট বা অধিকার সংরক্ষন মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছিলো। তবে মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রতিষ্ঠান অর্থ আর পেশী শক্তির বলে এই মামলার রায়কে অনেকটাই অমান্য করে চলেছে আজো। এই মামলার কাজ চলার সময়েই মাইক্রোসফট দুটো ভিডিও উপস্থাপন করে আদালতে যাঁর একটার মধ্যে প্রমাণের চেষ্টা ছিলো এই যে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ব্রাউজার ব্যতীত এই বিখ্যাত “খিড়কী” সিস্টেম স্লো হয়ে পড়ে। আর অপরটিতে দেখানো হয়েছিলো যে কতো সহজে আমেরিকা অনলাইন বা এওএল ব্যবহারকারীরা নেটস্কেপ নেভিগেটর “খিড়কী” সিস্টেমে ইন্সটল করা যায়। মজার বিষয় হলো আদালতে উপস্থাপিত তথ্যচিত্রের দুটোই বানোয়াট প্রমাণিত হয় এবং মাইক্রোসফট আদলতকে ফাঁকি দেবার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়।

এটা অত্যন্ত সহজ বিষয় যে মাইক্রোসফটের একটা অপারেটিং সিস্টেম যেটার প্রতিটা সংস্করন বাজারজাত করনের আগে সে এমনভাবে বিপনন ও বিজ্ঞাপন ছড়ায় যে এটার চাইতে শক্তিশালী আর কোন অপারেটিং সিস্টেম ডেক্সটপের দুনিয়ায় হতেই পারেনা তা কিনা একটা ওয়েব ব্রাউজারের কারনেই সমস্যাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। আর নেটস্কেপ নেভিগেটর তো তৎকালীন সময়ে “খিড়কী” তে ইন্সটল করা ছিলো বিশাল একটা জটিল প্রক্রিয়া যা কিনা মাইক্রোসফট সেই তথ্যচিত্রে ছেঁটে বাদ দিয়ে তারপর উপস্থাপন করেছিলো। মজার বিষয় হলো আদালত এই দুইটা বিষয়ই আদালতের কম্পিউটারে নিরীক্ষা করে দেখতে এবং প্রমাণ করতে বলেন মাইক্রোসফটের দুইজন ভাইস প্রেসিডেন্ট পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে। এবং তাঁরাই কাজগুলো করতে ব্যর্থ হন ও স্বীকার করে নেন যে মাইক্রোসফট এ বিষয়ে প্রতারনার আশ্রয় নিয়েছে।

ফলাফলে আপনি এতদিন ধরে যে চটকদার বিজ্ঞাপনের মোহে মোহাবিষ্ট হয়ে/না জেনে-বুঝেই আবর্জনা আর ছাইপাশ গিলছিলেন, গিলেছেন, গিলছেন এবং গিলবেন তা তো নিশ্চয়ই পরিষ্কার বুঝে উঠতে পারছেন।

এছাড়া এই মামলায় মাইক্রোসফট সবচাইতে বড় যে ধাক্কাটা খায় তা ছিলো “গোপন ও অনৈতিক ব্যবসায়িক চুক্তিতে বাধা”, যা মাইক্রোসফট ইন্টেল, এইচপি, ডেল এইরকম নামীদামী প্রতিষ্ঠানের সাথে করতো। কি থাকতো এইসব চুক্তিতে? এই চুক্তিগুলোর মূল উদ্দেশ্যই থাকতো হার্ডওয়্যার ভেন্ডরদেরকে বাধ্য করা যেনো তাঁরা মাইক্রোসফট বাদে আর অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সফটওয়্যার/হার্ডওয়্যার ড্রাইভারের বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হতে না পারে। এছাড়াও উইন্ডোজের ওইএম এডিশন প্রিইন্সটলড অবস্থায় এই সব নির্মাতার পিসি/ল্যাপটপ/নেটবুক গুলোতে দিতে বাধ্য করা যাঁর মাধ্যমে মাইক্রোসফটের পরবর্তী প্রজন্মের ক্রেতা সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশে সফটওয়্যার পাইরেসী আর অসচেতন ব্যবহারকারীর বদৌলতে অবশ্য এইসব চুক্তি না করেও প্রচুর পরিমানে স্বয়ংক্রিয় বিপনন আর বিজ্ঞাপন পেয়ে গিয়েছে, পাচ্ছে আর পাবে। আরো বিস্তারিত জানতে পড়ে নিতে পারেন — http://en.wikipedia.org/wiki/United_States_v._Microsoft

আসুন এবারে অফিস প্যাকেজের বিষয়টাতে। এখানে তো আপনি নিজেই ভুক্তভোগী। বুঝতেই পারছেন মাইক্রোসফট কিভাবে বাধ্য করতে পারে একজন ব্যবহারকারীকে নিজের পছন্দের সফটওয়্যার ব্যবহার ছেড়ে নতুন আসা পন্যের ব্যবহারে। একবার ভাবুন তো যদি এটা আপনি বাজারে ৬০টাকা ঐ ডিভিডিটাতে কিনতে না পেতেন কিংবা আপনার প্রতিষ্ঠান লাইন্সেসিং করতে দেরী করতো তো আপনার কাজের কি দশা হতো? আর যদি এমন হতো যে আপনি আপনার নিজের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স করবেন সফটওয়্যারগুলোর তো তাতে বছর পাঁচেকের মধ্যে কি ঘটবে? খেয়াল করে দেখেন মাইক্রোসফট একটা পন্য থেকে নতুন একটা পন্যে আপগ্রেড করতে দেয় ঠিকই তবে লাইসেন্সিংয়ে কিন্তু পুরোনো ব্যবহারকারী হিসেবে আপনাকে কোন ছাড় দেয় না। বরংচ নতুন পন্য হিসেবে দামটা কমই দিচ্ছেন এই হিসেব দেখিয়ে যে পয়সাটুকু কেটে নেয় তাতে আপনি নতুন আসার সফটওয়্যারের প্যাকেজটা আপগ্রেড না করে নতুন লাইসেন্স করেই নিতে পারতেন।

শুধু ব্রাউজার কিংবা অফিস প্যাকেজই নয়। মাইক্রোসফট এগুলো ছাড়াও আরো কিছু অপরাধ করে থাকে যাকে “মনোপলি” বলা চলে। যেমন —
১. নির্দিষ্ট কিছু হার্ডওয়্যার ব্যতীত তাঁর কোন সাপোর্ট পাবেন না বলে একপ্রকারে প্রযুক্তিপন্যের ক্রেতাকে বাধ্য করা হয় মাইক্রোসফট অনুমোদিত প্রস্তুতকারকের পন্যটাই কিনতে।
২. মাইক্রোসফটের প্রতিটা নতুন অপারেটিং সিস্টেম/অফিস প্যাকেজ রিলিজের সাথে সাথে হার্ডওয়্যার রিকয়ারমেন্টস এতটাই বদলে ফেলা হয় যে নতুন হার্ডওয়্যার কিনতে ব্যবহারকারী বাধ্য হন।
৩. নিজের পন্য/সফটওয়্যার ব্যতীত ব্যবহারকারীর পছন্দের সফটওয়্যার “জানালা” সিস্টেমে ধীরে ধীরে ধীরগতির করে দেয়া হয়/কখনো কখনো প্রোগ্রাম রান করার সময় হুট করেই ক্রাশ করে যায়। যেনো ব্যবহারকারীর মনে ঐ ব্যবহারকারীর মনে বিরূপ ধারনার জন্ম নেয়।
৪. নিজের অপারেটিং সিস্টেমের ত্রুটি আড়াল করে মাইক্রোসফটের “জানালা” সিস্টেম কখনো কখনো অন্য কোন সুখ্যাত সফটওয়্যার নির্মাতার পন্যকেও “ম্যালিশাস” হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ইন্সটল ও ব্যবহারে বাধা দেয়। কখনো কখনো ঐ সফটওয়্যার অতিপ্রয়োজনীয় হলে “জানালা” সিস্টেমের নিরাপত্তা/ফায়ারওয়াল ব্যবস্থাকে বন্ধ করে কাজ করতে বাধ্য হতে হয়। এই ধরনের জটিল প্রক্রিয়ায় কাজ করতে অনেক সাধারন ব্যবহারকারীই অস্বস্তিবোধ করেন এবং যন্ত্রনা এড়াতে মাইক্রোসফট পন্যই ব্যবহার করতে উদ্যোগী হন।
৫. কোন সফটওয়্যার হুট করে কাজ বন্ধ করে দিলে কিংবা সিস্টেমের কোন কাজ আটকে গেলে তা ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রনের বাইরে রাখা হয় এবং এই বিষয়টা নিয়ে মাইক্রোসফটকে রিপোর্ট করা ছাড়া আর কোন উপায়ই রাখা হয়নি। ফলে অফিসিয়াল সাপোর্ট একমাত্র মাইক্রোসফট স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি ছাড়া পাওয়া সম্ভব না। একই সাথে এই অবস্থায় বিকল্প কোন সফটওয়্যারের ব্যবহারে কাজটুকু করে নেয়া সম্ভব হবে সেটার কোন নির্দেশনা/তথ্য অপারেটিং সিস্টেমের ভেতরের সহায়িকাগুলোয় পাওয়া অসম্ভব। মানে জ্ঞানের বিকাশে বাধা সৃষ্টির সর্বোত্তম প্রচেষ্টা।

সবচাইতে বিরক্তিকর বিষয়টা যা এ অবদি আমি নিজে মাইক্রোসফটের প্রতিটা লাইসেন্সিং নথি পরীক্ষা করে পেয়েছি সেই মতে —
মাইক্রোসফটের প্রতিটা সফটওয়্যারই গ্যারান্টি/ওয়ারেন্টি/তথ্যের ক্ষতিতে ক্ষতিপূরনে অস্বীকার করে। তাহলে ব্যবহারকারী কি সম্পূর্ন নিজ দ্বায়িত্বে এই পন্যের ব্যবহার করবে? যদি তাই হয় তো এত বিশাল মূল্যমানের বিদেশী অর্থের বিনিময়ে কেনা পন্যের ব্যবহারকারীর স্বার্থ বা ক্রেতাস্বার্থ সুরক্ষিত হলো কোথায়? এটা কি খাবার দিয়ে পানি না দেবার মতো কাজ না? এটা কি ছাদ ছাড়া দালানে থাকতে দেবার মতো ব্যবস্থা নয়? এটা কি ডাক্তার ছাড়া সুচিকিৎসার নিশ্চয়তা দেয়ার মতো ফাজলামো না? এটা কি শিক্ষার নামে কুশিক্ষা নয়?

আশা করি এবারে নিজেকেই নিজে বলতে ও বোঝাতে পারবেন যে মাইক্রোসফটের এহেন কাজকর্ম কি ব্যবসা? নাকি জোর-জবরদস্তি করে লুট করা?

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৪) প্রকাশিত হবে আগামী ১৯শে জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ১) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ২৯শে ডিসেম্বর ২০১১ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ২) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ৫ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।

Posted in খেয়াল করুন, জেনে রাখুন, দেশ ও জাতির প্রতি দ্বায়বদ্ধতা, ভালো লাগা, ভালোবাসা

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ২)


তারিখ: ৫ই-জানুয়ারী-২০১২ইং

ভূমিকার পূর্বেঃ “উইন্ডোজ” অপারেটিং সিস্টেম কে আমি “খিড়কী” বা “জানালা” নামে ডাকতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। আমার এ লেখায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি লেখাটা পড়ে আহত হোন বা কষ্ট পেয়ে থাকেন তো সেইজন্যে আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। কিন্তু করার ও তো কিছু নেই। আমার লেখায় যদি আমিই শান্তি না পাই তো লিখবো কি করে‍‍? এই কাজটুকু করাই হতো না যদি না “প্রজন্ম ফোরাম” আর “উবুন্টু বাংলাদেশ” এর মেইলিং লিস্টে কিছু মানুষের ভুল ধারনা কে ভেঙ্গে দিতে কিছু কঠিন মন্তব্য না করতাম আর সেখানে আমাদের গৌতম দা আমাকে এই বিষয়ে বিশদভাবে লেখার জন্য উৎসাহ না দিতেন। গৌতম রয় কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার ভেতরের আমি কে টেনে-হেঁচড়ে বের করে নিয়ে আসবার জন্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটি আমি পর্ব আকারে বিগত ২৯শে ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী প্রতিটি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে প্রকাশ করছি এবং করবো ইনশাল্লাহ। আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় পর্ব। অষ্টম পর্বে লেখার উপসংহার প্রকাশ করার ইচ্ছে রয়েছে। প্রথম পর্বটিও আপনি পড়ে নিতে পারেন।

আজকের লেখায় আমি, ২। ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তায় অযাচিত হস্তক্ষেপ (Invading Privacy) বিষয়ে আলোকপাত করতে চেষ্টা করেছি।

আপনার কম্পিউটারকে বিভিন্ন কাজের নির্দেশনা কি আপনিই দিচ্ছেন? নাকি ! ? ! হুট করে কথাটা বলতেই আপনার মাথার ভেতরটা গুলিয়ে গেলো, তাই না? আসলে এই বিষয়টা নিয়ে আপনারই মতো আরো অনেকেই অনেক রকমের চিন্তা ভাবনা করে থাকেন। তবে সব ভাবনার কেন্দ্র কিন্তু একটি মাত্র বিন্দুতে এসেই মিলিত হবে। আর তা হলো আপনার ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বা সুরক্ষা। এমনকি এই বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে ভাববার পর আপনি কখনো কখনো এটাও চিন্তা করে থাকেন যে, আপনার কম্পিউটার শুধুমাত্র (একমাত্র বললে বিষয়টা পরিপূর্নতা পায়) আপনারই নির্দেশনা নেবে, এমনকি আপনার অতি প্রিয় মানুষটির নির্দেশনাও যেনো সে অমান্য/অগ্রাহ্য করে যায়। তো আপনার এই চিন্তা/আস্থার জায়গাটুকুকে দখল করতেই আসলে বিশ্বাসযোগ্য/আস্থাপূর্ন কম্পিউটিং এর ধারনাটা এসেছে। আরো বিস্তারিত তথ্য পাবেন উইকিপিডিয়ার এই পৃষ্ঠাতে — http://en.wikipedia.org/wiki/Trusted_Computing।

কিভাবে করা হচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তায় অযাচিত হস্তক্ষেপ? খেয়াল করে দেখুন আমি ঠিক আগের অনুচ্ছেদেই আপনার চিন্তা দখল হয়ে যাবার কথা বলেছি। তখন এই বিষয়টাকে হালকা করে নিলেও এই অনুচ্ছেদটুকু পড়ার পর হয়তোবা আপনার নিজেরই চোখ নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য হয়ে উঠবে। হয়তোবা আপনি এও চিন্তা করতে শুরু করবেন যে, তাহলে কি আপনি এতদিন নিজ গৃহে (কম্পিউটারে) দুধ-কলা দিয়ে সাপ পুষেছেন? ঐ যে আপনার বিশ্বাস কিংবা ভাবনার জায়গাটুকু যেখানে আপনি নিজের বাইরে আর কাউকেই আপনার কম্পিউটারে কোন রকম হস্তক্ষেপ করায় কিংবা করতে দিতে অনাগ্রহী ঠিক সেইটাকেই পুঁজি করে মাইক্রোসফট তৈরী করেছে বিশেষ একটা ব্যবস্থা, যার মনভোলানো নাম দিয়েছে — “আসল খিড়কীর মজা” বা Windows Genuine Advantage.

আসুন দেখি, কি এই “আসল খিড়কীর মজা” এটা মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ এক্সপি সিস্টেমের সাথে থাকা এমন একটি প্রযুক্তি যাঁর মাধ্যমে মাইক্রোসফট নিজের সার্ভার থেকে আপনার কম্পিউটারের বিভিন্ন হার্ডওয়্যারকে এক্সেস বা পরিচালনা করতে পারে। ভয়াবহ বিষয়টা হলো এই যে মাইক্রোসফট আপনার পিসিতে সবচাইতে বেশী যে যন্ত্রাংশটুকুর উপরে কর্তৃত্ব দখল করে নেয় সেটা হলো আপনার হার্ডডিস্ক। এই Windows Genuine Advantage (আসল খিড়কীর মজা) এর আসল মজাটা এখানেই যে, সে প্রাথমিকভাবে আপনার কাছ থেকেই বিভিন্ন চুক্তি/শর্তের মাধ্যমে আপনার হার্ডডিস্কের যত্রতত্র তথ্যানুসন্ধানের অনুমতিটুকু হাসিল করে নেয় এই বলে যে, “এটার মাধ্যমে সে আসলে আপনার কম্পিউটারের ভেতরে যে আসলেই একটি লাইসেন্সকৃত “জানালা” বা “খিড়কী” ওএস ব্যবহৃত হচ্ছে তা নিশ্চিত করা সহজতর হয়”। কিন্তু ষড়যন্ত্রমূলক বিষয়টাই এখানে যে, এই প্রাথমিক অনুমতিটুকু নেবার পরপরই আসলে মাইক্রোসফট দূরনিয়ন্ত্রিত সার্ভার থেকেই আপনার কম্পিউটারের পরিপূর্ন নিয়ন্ত্রন ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যায়। প্রতিফলনে যদি এমন কোন হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যার সে আপনার কম্পিউটারে পায়, যা কিনা মাইক্রোসফটের অনুমোদিত নয় কিংবা এই Windows Genuine Advantage এর নিয়ন্ত্রনের বাইরে তো সেক্ষেত্রে সে আপনার কম্পিউটারের কার্যকারীতা রহিত করার মতো ক্ষমতা রাখে।

এক্সপি’র ক্ষেত্রে এই http://www.microsoft.com /genuine/downloads/faq.aspx পৃষ্ঠার মাধ্যমে জানা যায় যে, মাইক্রোসফট যে সব তথ্যের ভিত্তিতে এই Windows Genuine Advantage বা WGA Checks সম্পন্ন করে থাকে তা হলো —
০১। কম্পিউটারটির নাম এবং মডেল
০২। বায়োস বা বেসিক ইনপুট আউটপুট সিস্টেম
০৩। MAC বা ম্যাক অ্যাড্রেস
০৪। Globally Unique Identifier বা GUID বা আপনার কম্পিউটারে প্রদত্ত এমন একটি সংখ্যা যা কিনা একমাত্র আপনার এই পিসির বর্তমান হার্ডওয়্যার কনফিগারেশনেই প্রযোজ্য হবে।
০৫। হার্ডডিস্কের ক্রমিক নম্বর
০৬। ভৌগলিক অবস্থান ও ভাষা সংক্রান্ত অপারেটিং সিস্টেমের সেটিংসসমূহ
০৭। অপারেটিং সিস্টেমটির সংস্করন
০৮। কম্পিউটারটির বায়োসের তথ্য (প্রস্তুতকারক, সংস্করন, প্রস্তুতকাল/তারিখ)
০৯। কম্পিউটারটির প্রস্তুতকারকের তথ্য
১০। ব্যবহারকারীর আঞ্চলিকতা সংক্রান্ত তথ্যাদি
১১। মেয়াদ যাচাইয়ের তথ্য এবং ইন্সটলেশন সংক্রান্ত তথ্যাদি
১২। খিড়কী অথবা মাইক্রোসফট অফিস প্যাকেজে’র পন্যযাচাইকরণ গোপন শব্দচাবি/ সংখ্যা
১৩। “খিড়কী”এক্সপি’র পন্যপরিচয়ের তথ্যাদি

এমন সব অভিযোগ রয়েছে এই WGA প্রযুক্তি নিয়ে যা শুনলে আপনি হয়তো বা সেই দুধ-কলা-সাপ সুত্রের বাস্তব প্রয়োগ জগতে চলে আসবেন। যেমন — এটি ব্যবহারকারীর বিনা অনুমতিতে কম্পিউটারে থাকা সফটওয়্যার বা গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র বেমালুম গায়েব করে দেয় (সংক্ষেপে বললে মুছে ফেলে)। এটা ব্যবহারকারীর কাছ থেকে সেই প্রাথমিক অনুমতিটুকু নিয়ে নেবার পর পরবর্তীতে আর কোন অনুমোদন ছাড়াই ‘খিড়কী’র সাথে নিজেকেই নিজে সাম্প্রতিকীকরন (আপডেট) করে থাকে এবং ব্যবহারকারীদেরকে খুব কম বেছে নেবার সুযোগ দেয় এই বিষয়ে যে, “কিভাবে মাইক্রোসফট এই সিস্টেমকে মনিটর করবে/করবে না।” অনেকে ব্যবহাকারীরই অভিযোগ যে, মাইক্রোসফটের এই WGA প্রযুক্তিটি আসলে একটি “নজরদারী প্রযুক্তি”, যদিও বা মাইক্রোসফট এই অভিযোগ অস্বীকার করে থাকে এবং সেই সাথে নিজেই এই প্রযুক্তি বিষয়ে সিদ্ধান্তসমূহ নেবার এবং তা জোরপূর্বক হলেও বাস্তবায়নের ক্ষমতাটুকু সংরক্ষন করে। এই কর্মকান্ডের মাধ্যমেই মাইক্রোসফট প্রমাণ করে দেয় যে, আসলেই এই প্রযুক্তিটি “ব্যক্তিতথ্য সুরক্ষা/নিরাপত্তা”র প্রতি মারাত্মক রকমের হুমকি। আরো জানতে পড়তে পারেন — http://en.wikipedia.org/wiki/Windows_Genuine_Advantage

উপরের লেখাটুকু পডতে পড়তে হয়তো বর্তমান সময়ের “খিড়কী” বা “জানালা” ওএস ব্যবহারকারীদের বুকের ভেতরে বাতাস আকুপাকু করা শুরু করেছিলো। তবে লেখাটুকুর শেষ লাইনটা পড়ার পর একটানে আটকে থাকা বাতাস বুক থেকে ঝেড়ে ফেলেছেন। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে মনের আনন্দে জপতে শুরু করে দিয়েছেন — “যাক বাবা আমি তো এখন আর ‘খিড়কী এক্সপি’ চালাচ্ছি না। আমি ‘সপ্তম জানালা’য় চলে এসেছি।” হয়তোবা সত্যজিৎ রায় এর সেই “গুপী গাইন বাঘা বাইন” চলচ্চিত্রের গুপী ও বাঘার ন্যায় মনের মধ্যেও ঢোল বাজছে আর সুর ভজে যাচ্ছে — “তাক ধিন্ ধিন্ না ধিন্ তা, নাইকো মোদের চিন্তা”। তো সেই আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা, ধিতাং ধিতাং বোলে নৃত্যানন্দে মেতে চলা মনের অধিকারীদের জন্য সুখবর — “সপ্তম জানালা’র” ক্ষেত্রে মাইক্রোসফট প্রযুক্তিটির কার্যকারীতায় আপনার জন্য কোনরূপ ইতিবাচক পরিবর্তন না এনে শুধুমাত্র নামটাকে বদলে দিয়েছে। এখন থেকে এটাকে আপনারা (হাড়ে হাড়ে) চিনবেন Windows 7 Activation Technologies বা WAT বা “সপ্তম জানালা সক্রিয়করন প্রযুক্তি” নামে। 🙂

আপনার পিসির পরিচালনা পদ্ধতিতে “সপ্তম জানালা” যুগান্তকারী কোন পরিবর্তন সাধন করুক চাই না করুক ইতোমধ্যে আপনার হৃদযন্ত্রের জানালা গুলো যে দুমদাম খুলছে আর কপাটে কপাটে ঝড়ের দাপটে বাড়ি খাচ্ছে সে আমি বিলক্ষন দেখতে পাচ্ছি। বুকের ধুকপুকানিটুকু কমে আসলে তবেই এই লেখার পরবর্তী অংশটুকু পড়ুন। তা না হলে দুম করে নিজের হৃদযন্ত্র কিংবা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেবার মতো ঘটনাও ঘটে যেতে পারে, এই আগাম সাবধানী করে রাখলুম।

সপ্তম জানালা’র সাথে আসা নতুন মাত্রার কিছু গোয়েন্দাপ্রযুক্তি “বিশ্বাসযোগ্য কম্পিউটিং” এই সুর তুলে মাইক্রোসফট নতুন যে প্রযুক্তিটুকু আপনাকে উপহার দিচ্ছে তার চটকদার নাম হচ্ছে – “Palladium”। এটি জার্মান ভাষার একটি শব্দ। তবে ইংরেজী/জার্মান থেকে বাংলায় অনূদিত প্রতিশব্দটি হবে – “রক্ষাকবচ” বা “সুরক্ষার দেবী”। চটকদার এই নামের বাহারে নিজের অজান্তেই আপনার কম্পিউটারে কি ঘটতে চলছে তা হয়তো এখন বুঝতে পারছেন না। তবে জেনে রাখুন এই প্রযুক্তির পূর্বে প্রোপ্রাইটরী বা মালিকানাধীন সফটওয়্যার গুলোয় ম্যালিশাস বা কম্পিউটারের ব্যবহারকারীর জন্য ক্ষতিকারক কিছু অংশ বা বৈশিষ্ট্য থাকতো বা থাকতে পারতো। আর এই প্রযুক্তি এই ক্ষতিকারক বৈশিষ্ট্যসমূহকেই প্রকারান্তরে বৈশ্বিকভাবে চুড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে দিলো। আরো বিস্তারিত জানতে চাইলে — http://en.wikipedia.org/wiki/Next-Generation_Secure_Computing_Base পড়ে নিতে পারেন।

এই “সুরক্ষার দেবী” কে ব্যবহার করে হলিউড আর বিখ্যাত রেকর্ডিং প্রতিষ্ঠানগুলো আপনার ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তায় অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে পারবে। কিভাবে? তো জেনে নিন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এটা নির্ধারন করা সম্ভব যে কোন কম্পিউটারে একটি সুনির্দিষ্ট চলমান চিত্র বা ভিডিও কিংবা গান ডাউনলোড হয়েছে এবং তারপর সেই নির্দিষ্ট ডাউনলোড করা গান বা ভিডিওটি উক্ত যন্ত্র (পিসি/নেটবুক/ট্যাবলেট পিসি/মুঠোফোন) ব্যতীত আপনারই নিজের অন্য কোন যন্ত্র (পিসি/নেটবুক/ট্যাবলেট পিসি/মুঠোফোন) এ আপনার নিজেরই চালানোর অনুমতি রহিত করা যেতে পারে। ফলে একই জিনিষ বারংবার ডাউনলোড করতে আপনাকে বাধ্য করা হবে। আর যখন এই কাজটুকু নিখুঁতভাবে সব যন্ত্র সমূহে করা হবে তখন নিশ্চয় অতি সহজ হিসাব মেলাতে আপনার কষ্ট হচ্ছে না যে আপনার পিসি/নেটবুক/ট্যাবলেট পিসি/মুঠোফোন এর প্রতিটি ফাইল/নথি আপনার নাকি অন্য কারো নিয়ন্ত্রনাধীনে থাকছে। এখান থেকে আরো একটু বিস্তারিত জানতে পারেন — http://en.wikipedia.org/wiki/Next-Generation_Secure_Computing_Base#Digital_Rights_Management

আর উপরের ঘটনাটা যদি হুবহু ঘটানো হয় তো একপ্রকারে ধরে নেয়া যায় যে আপনার সাথে আপনার পরিচিত সবার সম্পর্ক ছিন্ন হতে চলেছে। কেননা এই প্রযুক্তি আপনাকেই আপনার ডিভাইসগুলোতে আপনারই মালিকানাধীন ফাইলটি শেয়ার করতে দিচ্ছে না তো সেখানে অন্য কারো সাথে সেটা কিভাবে আপনি শেয়ার করবেন। আর যদি এই প্রযুক্তি শুধুমাত্র শেয়ারিং বন্ধ করেই থেমে যেতো তো ভালো ছিলো। তবে তার বদলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ করে তুলছে এই প্রযুক্তি। যেমন ধরুন এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা হলো প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র আর ইমেইলের ক্ষেত্রে, তো কি ঘটবে? একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাইরে সেই নথি আর কারো জন্যেই ব্যবহার উপযোগী থাকবে না। আবার এটাও করা সম্ভব যে নথিটি কম্পিউটার ব্যতীত অন্য কোন যন্ত্রে পড়াও যাবে না। বিস্তারিত পাবেন — http://www.gnu.org/philosophy/no-word-attachments.html

ভুতুড়ে হলেও সত্যি যে এটা করা সম্ভব যে একটা ইমেলই আপনি পেলেন যেটা কিনা দুই সপ্তাহ বাদেই আপনার ইনবক্স থেকে বেমালুম হাওয়া (গায়েব)। ধরুন এমনটা যদি ঘটে যে আপনি যে প্রতিষ্ঠানে চাকুরীরত সেই প্রতিষ্ঠানেরই গুরুত্বপূর্ন কর্তাব্যক্তিদের একজন আপনাকে ইমেইলে এমন একটি বিষয়ে কাজ করতে অনুমোদন/আদেশ দিলেন যেটা ঐ প্রতিষ্ঠানের জন্য জটিল বা বিপদজনক হতে পারে। একমাস পরে আপনার ঐ কাজটুকুর প্রতিফল সত্যি সত্যিই প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপদজনক বা জটিল হয়ে দাঁড়ালো আর তখন এই বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্তগ্রহনকারী বা কর্মসাধনকারী হিসেবে চিহ্নিত হবেন একমাত্র আপনি। কেননা সেই ইমেইলটি প্রমাণ স্বরূপ আপনি দেখাতেই পারলেন না যার প্রধান কারন সেই নির্দেশনা/আদেশটুকু ছিলো এমনই কালি দিয়ে লেখা যা অদৃশ্য হতে পারে। এই বিষয়ে আরো তথ্য পেতে পারেন — http://www.cl.cam.ac.uk/~rja14/tcpa-faq.html

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৩) প্রকাশিত হবে আগামী ১২ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ১) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ২৯শে ডিসেম্বর ২০১১ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।