Posted in খেয়াল করুন, জেনে রাখুন, দেশ ও জাতির প্রতি দ্বায়বদ্ধতা, ভালো লাগা, ভালোবাসা

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ১)


তারিখ: ২৯শে-ডিসেম্বর-২০১১ইং

ভূমিকার পূর্বেঃ “উইন্ডোজ” অপারেটিং সিস্টেম কে আমি “খিড়কী” বা “জানালা” নামে ডাকতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। আমার এ লেখায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি লেখাটা পড়ে আহত হোন বা কষ্ট পেয়ে থাকেন তো সেইজন্যে আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। কিন্তু করার ও তো কিছু নেই। আমার লেখায় যদি আমিই শান্তি না পাই তো লিখবো কি করে‍‍? এই কাজটুকু করাই হতো না যদি না “প্রজন্ম ফোরাম” আর “উবুন্টু বাংলাদেশ” এর মেইলিং লিস্টে কিছু মানুষের ভুল ধারনা কে ভেঙ্গে দিতে কিছু কঠিন মন্তব্য না করতাম আর সেখানে আমাদের গৌতম দা আমাকে এই বিষয়ে বিশদভাবে লেখার জন্য উৎসাহ না দিতেন। গৌতম রয় কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার ভেতরের আমি কে টেনে-হেঁচড়ে বের করে নিয়ে আসবার জন্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটি আমি পর্ব আকারে আসন্ন প্রতিটি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে প্রকাশ করবো। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব। অষ্টম পর্বে লেখার উপসংহার প্রকাশ পাবে ইনশাল্লাহ।

কেন মাইক্রোসফটের নিম্নোক্ত কাজগুলোকে অন্যায় বলেছি তা নিয়ে উত্তেজিত হয়ে যাবেন না যেনো। আগে আমার লেখাটা পড়ে, জেনে, মর্মোদ্ধার করে বুঝে নিন। তারপর যদি দেখেন যে আমার এই লেখা বা মূল সুত্রের লেখায় কোন অংশে ত্রুটি রয়েছে তো আমাকে জানাবেন। আমি সংশোধনীটুকু দেবার/করে নেবার প্রয়াস পাবো। সেই সাথে নিজেও নতুন কিছু জানবার ও শেখবার সুযোগ পাবো। আর আটটি পর্বের কথা তো পূর্বেই উল্লেখ করেছি, তাই লেখাটুকু আট পর্বে সম্পূর্ন প্রকাশিত করবার পূর্বে আমি নিজে এই লেখা নিয়ে কোন প্রশ্নের উত্তর/মন্তব্য দেবো না।

ভূমিকাঃ আমার এই লেখাটি কোন মৌলিক রচনা নয়, সংকলিত একটি অনুবাদ মাত্র, সাথে ব্যক্তিগত কিছ মতামত, মন্তব্য আর চিন্তার প্রকাশ অঙ্গাঅঙ্গীভাবেই জড়িয়েই পুরোটা লেখা হয়েছে। মূল লেখার সুত্রঃ http://en.windows7sins.org/#education-more । আসলে এই কাজটুকু হুবহু অনুবাদের মতো কিছু নয়, চেষ্টা করা হয়েছে যথাসম্ভব সঠিক ভাবটুকু বজায় রেখে সঠিকরুপে, সহজ বাংলায় বর্ননা করতে।

পাদ প্রদীপের আলোটুকু যেখানে নিপতিতঃ এই লেখাটির মূল বক্তব্যই হচ্ছে windows বা “জানালা” অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে, যাঁর মাধ্যমে মাইক্রোসফট আপনার কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রনের জন্য আইনগত দিক থেকে সব রকমের কর্তৃত্বের অনুমতিই নিয়ে নিচ্ছে এবং সেই ক্ষমতাকে সম্পূর্নরূপে অপব্যবহার করে মাইক্রোসফট ঐ কম্পিউটারের সকল ব্যবহারকারীদেরকে অন্যায়ভাবে প্রভাবিত/প্ররোচিত/পরিচালিত করার প্রয়াস নিচ্ছে। তো সেই ‘গুরুতর পাপ’ বা ‘অন্যায়’ যা মাইক্রোসফট করেছে, করছে এবং করতে যাচ্ছে তা সম্পর্কে আপনাদের সবার দৃষ্টি আকর্ষনের জন্যেই আমার এই প্রয়াস।

যে সাতটি ‘পাপ’ বা ‘অন্যায়ে’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ/সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আমার এই লেখা –

১। শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ায় বিষ প্রয়োগ (Poisoning Education)
২। ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তায় অযাচিত হস্তক্ষেপ (Invading Privacy)
৩। একচেটিয়া ব্যবসার লক্ষ্যে অনৈতিক আচরন (Monopoly Behavior)
৪। ব্যক্তি স্বাধীনতায় পরিপন্থী অনৈতিক বাধ্যগতকরণ (Lock-in)
৫। আদর্শমানদন্ডের অপব্যবহার (Abusing Standards)
৬। ডিজিটাল রেষ্ট্রিকশন ব্যবস্থাপনার বলপূর্বক প্রয়োগ (Enforcing DRM)
৭। ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার প্রতি হুমকি (Threatening user security)

আজকে আমি, ১। শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ায় বিষ প্রয়োগ (Poisoning Education) বিষয়ে আলোকপাত করবো

শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন কি? শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে একটা বানী বহুল প্রচলিত আছে – “তুমি একজন মানুষকে একটা মাছ দাও এবং তাঁর একটা দিনের খাবারটুকু নিশ্চিত করো। আর যদি তুমি তাঁকে মাছ ধরতেই শিখিয়ে দাও তো তুমি তাঁর জীবনকালের জন্যেই খাবার নিশ্চিত করবে।”

আমার নিজের বোধ থেকে যদি বলি তো – “মানুষের জীবনধারনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু কে জানতে, বুঝতে ও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শিখতে সে প্রক্রিয়াটুকুর মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাই শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন।”

আমাদের আগামী প্রজন্মের শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন একটি সরঞ্জাম হিসেবে কম্পিউটারের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে, যাঁদের শিক্ষাক্রমে কম্পিউটারকে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তাঁদেরকে শুধুমাত্র একটা সুনির্দিষ্ট কোম্পানীর পন্যের ব্যবহার্যবিধিই শেখানো হচ্ছে: মাইক্রোসফট’র পন্য। মাইক্রোসফট প্রচুর পরিমানে অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে বিভিন্ন পরামর্শদাতা ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান এর জন্য (এমসিপি, এমএসপি) যাতে করে বিপনন প্রকিয়া সহজতর হয় আর শিক্ষা বিভাগের সহায়ক বিষয়গুলোকে নিজের আয়ত্তে আনা যায়।

কিভাবে ঘটছে শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ায় বিষ প্রয়োগ? আসলে মাইক্রোসফটের আয়ের বিশাল খাতসমূহের অন্যতম একটিই হলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষা মাধ্যম আর তাই অত্যন্ত কৌশলে আগামীদিনের নাগরিকদেরকে নিজের পন্যের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে নেয়ার প্রয়াসের শুরুটা এখানেই। শিক্ষামাধ্যমগুলোয় শিক্ষার্থীদেরকে মাইক্রোসফটের বিভিন্ন পন্য এবং এই “জানালা” অপারেটিং সিস্টেম চালনা করতে শেখানোর মাধ্যমে আসলে শিক্ষার্থীদের বাবা-মা/অভিভাবকদেরকে একপ্রকারে বাধ্যই করা হচ্ছে বাসা-বাড়ীতেও সেই একই প্রতিষ্ঠানের পন্য ব্যবহার করতে, অন্যথায় ঐ শিক্ষার্থীর শিক্ষার পরিপূর্নতা বাধাগ্রস্ত হবার ভীতি কাজ করছে। একরকম জোরজবরদস্তি মূলকভাবেই একটা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পন্যকে শিক্ষার্থীদের সামনে বাধ্যতামূলক শিক্ষা উপকরনরূপে উপস্থাপন করার দৃশ্য আর কোথাও কি আপনি দেখতে পান?

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যই মাইক্রোসফটের পন্যের বিপননে সহযোগীতা করে চলেছে, হয়তো মূল বিষয়টা সচেতনভাবেই এড়িয়ে গিয়ে কিংবা সেটা না বুঝেই, যেহেতু ঐ রাজ্য সরকারের উপরে এই প্রতিষ্ঠান তাঁদের দেয়া বিনামূল্যের পন্যগুলোর মাধ্যমে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছে। কেননা মাইক্রোসফটের প্রতিটা সফটওয়্যার/পন্যই মালিকানাধীন এবং আবদ্ধকৃত, যা কিনা “শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জন” এর সাথে পুরোপুরিই অসামঞ্জস্যপূর্ণ – “জানালা” সিস্টেমের ব্যবহারকারীরা আসলে দ্বিতীয় শ্রেনীর গ্রাহক বা অসচেতন ক্রেতা মাত্র। কেননা যখনই একজন ব্যববহারকারী এই “জানালা” সিস্টেমটা ব্যবহার করছে তাঁদেরকে আইনগতভাবেই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বেঁধে ফেলা হচ্ছে যেনো নিজের চাহিদানুযায়ী বা কোন নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানে এই প্রতিষ্ঠান ব্যতীত অন্য কোন সফটওয়্যার তাঁরা ব্যবহার না করতে পারেন, এমনকি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদা নিবারনেও বাঁধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। যেমন উদাহরন স্বরূপ বলা যেতে পারে যদি কেউ ইচ্ছে করে যে আসলে এই “জানালা” সিস্টেম, কোন ব্যবহারকারীর কাছ থেকে নির্দেশনা নেবার পর কিভাবে সেই নির্দেশনাটুকু প্রক্রিয়াকরণ করছে সেটা বিস্তারিত জানবে তো সেটা অসম্ভব, এমনকি এর সোর্সকোডটুকুও গোপন করে রাখা হয়।

শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহারের আসল উদ্দেশ্যই হলো জ্ঞানের ক্ষেত্রে পরিপূর্ন স্বাধীনতা অর্জন এবং তা সুদৃঢ়করণ, এটা নয় যে, কোন একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান কূটকৌশলের প্রয়োগে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখবার পথটুকু সুগম করে নেবে।

মুক্ত সফটওয়্যার গুলো এক্ষেত্রে সঠিক কাজটাই করে থাকে, যা একজন শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করে নিজের জ্ঞানার্জন প্রকিয়াটাকে সুদৃঢ় করতে, বিভিন্ন বিষয়ে নতুন নতুন দিক উন্মোচনের আর শিক্ষা গ্রহনের। আপনি হয়তোবা প্রশ্ন তুলবেন যে, “তাহলে মুক্ত সফটওয়্যার সহযোগে শিক্ষাক্রমের লক্ষ্যে ওএলপিসি বা ওয়াল ল্যাপটপ পার চাইল্ড প্রকল্পে কোন সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রকাশিত হয়নি কেন?” ২০০৩ইং সালে এমআইটি’র প্রফেসর নিকোলাস নেগ্রোপন্টে এই প্রকল্পটি শুরু করেন এই লক্ষ্যে যে বর্তমানের শিশুরা আগামীর শিক্ষা ও প্রযুক্তির ছোঁয়া পাবে তথ্যপ্রযুক্তি আর জ্ঞানার্জনের স্বাধীনতার যুগ্মপৎ প্রয়োগের মাধ্যমে। সেই লক্ষ্যে এই প্রকল্প অতি স্বল্পমূল্যে যন্ত্র তৈরীর উদ্যোগ নেয় (শুরুর দিকের যন্ত্রটির নামকরণ করা হয়েছিলো এক্সও/যো/XO) যেনো লক্ষাধিক শিশু এই যন্ত্রটি ব্যবহার করে সুবিধাভোগী হতে পারে এবং তাতে প্রযুক্ত করা হবে মুক্ত সফটওয়্যার যেনো তাঁরা নিজেদের অর্জিত জ্ঞান এবং মানোন্নয়নকৃত সফটওয়্যার একে অপরের সাথে পছন্দানুযায়ী বিতরন বা শেয়ার করতে পারে। আরো জানতে দেখুন: http://laptop.org/en/vision

তো ঠিক এই পর্যায়ে এসেই মাইক্রোসফট এতটাই চাপ প্রয়োগ করতে থাকে এই প্রকল্পে যে নেগ্রোপন্টে এই প্রকল্পের মূল যে লক্ষ্য সেই স্বাধীনতা বা মুক্তপ্রযুক্তি’র প্রতিশ্রুতিটুকু থেকে পিছিয়ে এসে ঘোষনা করতে বাধ্য হন যে এই প্রকল্পের যন্ত্রগুলোয় স্বাধীনতা খর্বকারী “জানালা এক্সপি” চালানোর ব্যবস্থাও রাখা হবে। (http://www.olpcnews.com/files /microsoft_emails_on_olpc.pdf )

মাইক্রোসফট শুধু এই হুমকি প্রদানের মাধ্যমেই ক্ষ্যান্ত দেয়নি, বর্তমানে মাইক্রোসফটের লক্ষ্য সেই সকল দেশের সরকার যাঁরা এই XO বা যো নামের যন্ত্রগুলো কিনছে, যেনো সরকারের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করিয়ে ওই যন্ত্রগুলোর মধ্যকার মুক্ত সফটওয়্যারগুলোকে “জানালা” এবং সহায়ক মালিকানাধীন সফটওয়্যার দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়। মাইক্রোসফট এই উদ্যোগে কতটুকু সফল, তা আগামীই বলে দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত করেই বলা যায় যে নিজের পুরো ক্ষমতাটুকু খাটিয়ে এই হুমকি প্রদানের মাধ্যমে মাইক্রোসফট এমন একটি প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করেছে যা কিনা ইতোমধ্যে দশ লক্ষ হতদরিদ্র শিশুর জন্য বিশ্বজুড়ে বিতরন করা হয়েছিলো স্বল্পমূল্যে এবং মুক্ত সফটওয়্যার চালিত প্রযুক্তিতে এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ঐ শিশুদেরকে এখন নিজের পন্যের প্রতি একান্তই নির্ভরশীল করবার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। ওএলপিসি প্রকল্পে এই হুমকি প্রদান হচ্ছে এমনই একটা উদাহরন যার মাধ্যমে মাইক্রোসফট প্রমাণ করেছে যে, মাইক্রোসফট কিভাবে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকারকে এই ভ্রান্তধারনার প্রতি অনুরক্ত করে থাকে যে, কম্পিউটার প্রযুক্তির ব্যবহারে শিক্ষা মানেই হলো “জানালা” অপারেটিং সিস্টেম ও অন্যান্য সকল অনুষঙ্গ সফটওয়্যার।


“আমাকে অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাতে হচ্ছে মিঃ ক্রাইষ্ট. যে আপনি শুধুমাত্র দুইটি মাছ ও পাঁচটুকরো রুটির জন্যেই আমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ। অন্যরা বেশী কিংবা কম যা খুশি পান না কেন, আপনি এর বেশী আর কিছুই পেতে পারেন না।”

সমগ্র বিশ্বকে এই ভয়ংকর অবস্থা থেকে বের করে নিয়ে আসতেই মুক্ত সফটওয়্যার ফাউন্ডেশন (Free Software Foundation বা FSF) কাজ করে যাচ্ছে।

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ২) প্রকাশিত হবে আগামী ৫ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।

Advertisements
Posted in কিভাবে কিভাবে যেন লিখে ফেললাম, খেয়াল করুন, জেনে রাখুন, পরিচয় পর্ব, প্রযুক্তি নিয়ে আউলা চিন্তা, ভালো লাগা, ভালোবাসা

K ফর কাউয়া আর A ফর এটিএস


১৫ই ডিসেম্বর ২০১১ইং সকাল ৭:০০

কাঁ কাঁ, কাঁ কাঁ, কাকের কলরব। কোলকাতার কাকের কলকাকলীতে কর্নকুহর কম্পিত। কাকের এই KA KA শব্দ যে এই সকাল থেকেই জ্বালাতন শুরু করে দিলো তা বলাই বাহুল্য। জীবনে প্রথমবারে মতো ধনুষ্টংকারের আতংকে আতংকিত হবার মতো বিষয়খানি যে এই KA KA শব্দের বিস্তৃতির মধ্যেই অন্তর্নিহিত তা কে জানতো তখন? দুপুর না গড়াতেই ভাবসম্প্রসারন যোগে পরিষ্কার বোঝা গেলো K ফর কাউয়া আর A ফর এটিএস (ধনুষ্টংকার প্রতিষেধক টিকা) 🙂 ।

বুঝতে পারছি। আজকে আমার এই লেখার শুরুর অংশটুকু পড়বার পরে আপনাদের প্রত্যেকের মনে নানান রকম প্রশ্ন উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছে। আমি আবার সম্মান শ্রেনীতে পড়বার সময় আমার মূল বিষয় ইংরেজী সাহিত্যের সাথে সাথে অতি আহ্লাদের সাথে বেছে বেছে মনোবিজ্ঞান, দর্শন আর ইতিহাসকেই আঁকড়ে ধরেছিলাম (আমিই আঁকড়ে ধরে ছিলাম না স্বয়ংক্রিয় বাছাই প্রক্রিয়ায় ওঁরাই আমায় আঁকড়ে ধরেছিলো সেই নিয়ে আরেক কাহিনী বলতে হবে 😀 ) কি না ??? তো সেই ভয়াবহ জ্ঞানার্জনের বোধটুকু থেকেই আপনাদের মনের সেই উঁকিঝুঁকির ক্ষেত্রের বিস্তৃতি যতটুকু বুঝতে পারছি তা হলো —
আসুন অনুমান করি (১) — রিং ভাই মনে হয় কাকের KA KA ধ্বনিতে বিরক্ত হয়ে কোলকাতার কাকবাহিনীর কোন/কতিপয় বীর সেনানীকে গুলাতি/ঢিল অস্ত্রের আঘাতে আহত করেছেন। এবং সেই আঘাতের বদলা নিতে কাকবাহিনী ওনাকে সুকঠিন “কাকচঞ্চু” কি জিনিষ? তা বুঝিয়ে ছেড়েছে। অতঃপর . . .

আসুন অনুমান করি (২) — রিং ভাই মনে হয় এবারের কোলকাতা অভিযানের প্রথম নিরীক্ষা “কাক বাহিনীর আদ্যোপান্ত” বিষয়েই করছিলেন। হঠাৎই কাক বাহিনীর দুই পক্ষের মধ্যকার দ্বন্দ্ব যুদ্ধের ‘ক্রসফায়ারে’ পড়ে রিং ভাই আহত। অতঃপর . . .

আসুন অনুমান করি (৩) — ঢাকায় রিং ভাই নিজের গৃহে পালিত কবুতর (কবুতর আকৃতির মুরগী বলাই সমীচিন, বহু কষ্টে এঁরা কদাচিৎ ওড়াওড়ি করে) গুলোকে বাঁচাতে নিয়মিতই কাক বাহিনীর প্রতি গুলাতি ও বরই বিচির মর্টার নিক্ষেপ করেন। এবার ওরাই জরূরী তারবার্তা দিয়েছিলো কোলকাতা ব্যাটালিয়নে। অতঃপর . . .

আসুন অনুমান করি (৪) — রিং ভাইয়ের কোলকাতাইয়্যা কোন আত্নীয় বোধহয় রিং ভাইয়ের মতোনটাই দেখতে (মাথায় বিশাল টাক এবং ফিগার মাশাল্লাহ আড়াইমন চালের বস্তার চাইতে কম কিছু না)এবং ঐ ব্যক্তিটি কিছুদিন আগেই এই কাকবাহিনীর কোন সদস্যদের ষাটফুটি প্রাসাদ (নারকেল গাছের ডগায় . . .) তছনছ করেছেন। তো “কালা কালা উয়ো মেরা বাপকা শালা” সুত্র মতেই রিং ভাই প্রাতঃকালীন ভ্রমনকালে প্রথমে টার্গেটেড এবং পরে . . .। অতঃপর . . .

আসুন অনুমান করি (৫) — ‘রিং-দ্য ডন’ অবশেষে . . .। কাউয়ার ক্ষপ্পরে, তাও উনার নানাবাড়ির পালাপোষা কাউয়া। ব্যাটায় বাংলার “খিড়কী” ওএস ব্যবহারকারীদের আর লিনাক্স ব্যবহারকারী(চিংড়ি মার্কা)দের বহুত জ্বালাতন করে। দুমদাম কথার পিঠে কথা শোনায়, যথা-তথা, যহন-তহন। পাইরেটস (পাইরেসী করে যাঁরা) দের হালায় ‘ডাকাইত’ না কইয়া, কয় ‘চোর’? হালার দুঃসাহসডা দেখছোস? হালায় আমাগো লাহান সফটওয়্যার চোর (থুড়ি ডাকাইত)গো মান-ইজ্জত সব ফালুদা কইরা ফালাইলো!!! আরে আজিব, তুই নিজের দ্যাশরে ভালোবাসবি তো বাস, তোরে বাধা দিছে ক্যাডা? কিন্তু দেশের বেবাকরে সঠিক পথ দেখানোর ঠিকা কি তরে দিছে? আমাগোরে চুরি/ডাকাতি করবার থন বিরত রাখবার চায়!! দ্যাশের মান-ইজ্জত বাড়াইবার চায়। বহুত বাড়ছিলো হালায়। আমরা তো হালার বহুত হেরা ফেরী করছি এই বছরের শুরুর দিকেরথন, ঠেঙ্গানিও দিছি (অনলাইন), মুরুব্বীগোরে দিয়া হুমকি দিছি, শাসাইছি, বদনাম গাইছি(অনলাইন, অফলাইন)। মাগার হালায় সিধা হয় নাইক্ক্যা। হালায় এক্কেরে কুত্তার লেঞ্জার লাহান তেড়ি খাইয়্যা দেশের মান বাঁচাইবার লাইগ্যা লাগছে। সরকারী-বেসরকারী ভার্সিটিগুলানে ভিজিট দিয়া দিয়া ‘ইয়াং জেনারেশনের’ ব্রেইন ওয়াশ করতাছিলো। সবতেরে বুঝাইবার চাইছে কেমতে দ্যাশের তথ্য পাচার হওন ঠেকান যাইবো। কেমতে দ্যাশের নাম চোর-ডাকাইতের খাতার থন সম্মানের খাতায় তোলন যাইবো। আরে মর জ্বালা, এই চুরি-চোট্টামি-ডাকাতি এইগুলান না থাকলে আমাগোর লাহান ‘কাউয়া’রা করবোডা কি? এইগুলান তো আমরা উত্তরাধিকার সুত্রে পাইয়া আইছি। অখ্খন এইগুলান ছাইড়া যদি বেবাকতে ভালা মানুষের লাহান চলবার চাই, তো দ্যাশ টিকবো? হালারে বুঝাইবারই পারি নাইক্ক্যা যে আমাগো লাইগ্যাই মিডিয়ার বরাতে আমগো দ্যাশডারে বৈদেশিক দাতাগোর সামনে ঝুড়ির লাহান বিছাইবার পারে আর আমরা কাড়ি কাড়ি ডলার (শর্তযুক্ত ভিক্ষা) আনবার পারি। আরে হালায় “ঋণ কইরা ঘি” তুই খাবি না তো কি হইলো? আমরা তো খামু, না কি? এইবার !! এইবার হালায় !!! বিদেশী কাকবাহিনীর হাতে সাইজ হইছে। অতঃপর . . .

“কৌন বনেগা ক্রোড়পতি” বা বাংলায় “কে হতে চায় কোটিপতি”র চাইতেও আপনাদের হাতে এখন একটা অপশন বেশী। আর এগুলোর থেকে আপনার পছন্দেরটি বেছে নেবার অথবা নিজস্ব কোন মন্তব্য করার সময়সীমা আগামী ২১শে ডিসেম্বর, ২০১১ সকাল ১০:১১:১০ অবদি। বেছে নিন এবং মন্তব্য করতঃ ফলাফলের অপেক্ষায় থাকুন। ২১ তারিখে লেখার বাকী অংশ প্রকাশিত হলে আপনার বেছে নেয়া অপশনটুকু অথবা মন্তব্যের সাথে মিলিয়ে নিন আমার নিজের অভিজ্ঞতা।

যদি মিলে যায় আংশিক কিংবা হুবহু, তো বিনিময়ে আপনি পাবেন, “আমার ডান বাহুতে প্রযুক্ত সেই ঐতিহাসিক ধনুষ্টংকার টীকা দেবার দৃশ্যে”র একখানি ঝকঝকা ফটুক (নোকিয়া ৭৬১০ সুপারনোভা’র ফ্ল্যাশযুক্ত ক্যামেরায় তোলা 😀 ) এবং হোটেল আমেনিয়া(পশ্চিববাংলা’র অধিবাসীদের জন্য)য় রুমালী রুটি ও মুরগীর ঝালফ্রাই সহযোগে অথবা চায়নাটাউনে(দিলকুশা, ঢাকা)র ফ্রাইড রাইস, ভেজিটেবল ও চিকেন কারী সহযোগে ইনশাল্লাহ আমার সাথে একত্রে দুপুরের খাবার উপভোগ করার সুযোগ। (এপার বাংলা ওপার বাংলা দুইপারের দুইজনকে বিজেতা করা হবে এই ঝালঝাড়া অনুমান অনুমান কুইজে, যিনি সবার আগে মূল ঘটনার সবচাইতে নিকটতম অনুমান/নিজ বক্তব্য করবেন তিনিই হবেন বিজয়ী)

লক্ষ্যনীয়ঃ পশ্চিমবঙ্গবাসী হলে উপহার বিজেতাকে আগামী ২৫শে ডিসেম্বরে এই পুরষ্কার গ্রহন করতে হবে। বাংলাদেশের বিজেতা বকেয়া থাকবেন, আমি দেশে ফেরবার আগে দিয়েই আপনার সাথে যোগাযোগ করবো।

আসুন মূল অভিজ্ঞতাটুকু জেনে নিই —
১৫ই ডিসেম্বর ২০১১ইং সকাল ১০:০০

মূল কাহিনীর প্রস্তুতি পর্বের শুরুটা অবশ্য আরো প্রায় দিন চল্লিশেক আগে। নিশ্চয়ই জানা আছে যে কোলকাতায় প্রায় দিন চল্লিশেক আগে সর্বশেষ বৃষ্টিপাত হয়েছিলো? তো সেই বৃষ্টির পানি আমার এক ফুপাতো বোনের বাসার ছাদে জমে গিয়ে কিঞ্চি শ্যাওলা উৎপন্ন করেছিলো। আর সেই শ্যাওলা শুকিয়ে চলটা ধরে রয়েছে এই দিন চল্লিশে। তো দিন সাতেক ধরে ভোরের কুয়াশায় সেই শ্যাওলা কিঞ্চিৎ ভিজে থাকে আর সকাল সাড়ে আটটা/নয়টা’র দিকে রোদ উঠলে সেগুলো বেশ সুন্দরই দেখায়। পায়ের নীচে পড়লে হালকা সুড়সুড়ি বোধের জন্ম দেয়। কোলকাতায় আসলে যে বাসায় আমি প্রায়শই অবস্থান করি আর যে ছাদটাতে আমি নিয়মিত সকাল বেলা হাঁটাহাটি করি। আর “ছাদটা” বললাম কেননা আমার এই বোনের বাড়ী তিনটে আর সবগুলোই চার তলা। এই ছাদটা ১নং বাড়ীর একটা ইউনিটের একতলার ছাদ। উপরের দিকে আর বাড়ায়নি বলে আমার খুব সুবিধে হয় এই ছাদটায় হাঁটতে (একটানা প্রায় ১২৫০ বর্গফুটের ছাদ), উপরি হিসেবে ছাদটা নিরাপদ, মানে চারদিকেতেই প্রায় চারফুট উঁচু দেয়ালে ঘেরা। (চারতলা গুলোর ছাদ অবদি উঠতে গেলে কলজেটা একেবারে শুকিয়ে যায়)

তো এই ১৫ই ডিসেম্বর সকালেও অন্যান্য দিনকার মতোই হাঁটাহাটির অভিপ্রায়ে ছাদে উঠেছি। বছর আষ্টেক এর এক নাতি এসে জুটলো (কোলকাতায় বর্তমানে আমার নাতি-নাতনির সংখ্যা মোটামুটি ১ ডজন :D)। “ও দাদা, এসো না ক্রিকেট খেলি?”। নাতির আবদার বলে কথা। লেগে গেলাম নাতিকে বল ছুঁড়ে মারতে। নাতি ব্যাট দুমদাম চালাচ্ছে আর আমি একটার পর একটা বল ছুঁড়ে মেরে বেশ মজা নিচ্ছি। তো পরপর নাতিকে ক্যাচ আউট করবার পর নাতি অফার দিলো ব্যাটটা হাতে নিতে। তো ব্যাটটা হাতে নিয়ে বেশ বাগিয়ে ধরে নাতির বোলিং মোকাবিলা করতে লাগলাম। কি সেলুকাস এখনো হালকা পাতলা মাটি কামড়ানো (আসলে হবে ঢালাই কামড়ানো) অফড্রাইভ, অনড্রাইভ করতে পারছি, বলের লাইনে পা যাচ্ছে মোটামুটি। মনটা বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠছে। তো নাতি বেশ কটা বার ভালো বল করার পর একটা বল অফসাইডে স্কয়ার কাট করার মতো দিয়ে বসলো। আমার কি আর দেরী সয়? একেবারে সপাটে চালিয়ে দিলাম। সাঁ করে বল বাতাসে ভেসে ছাদের বাউন্ডারী দেয়ালে উপর দিয়ে গিয়ে আপার বাগানে গিয়ে পড়লো। নাতি ঝেড়ে এক দৌড় দিলো সিঁড়ির দিকে আর আমি ছাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়ে গেলাম। ত্রিশ সেকেন্ড বাদে নাতি বাগানের মধ্যে থেকে ছাদে বলটাকে ছুঁড়লো আর আমি সেটাকে ক্যাচ ধরতে পিছনের দিকে হাঁটতে লাগলাম। বলা নেই কওয়া নেই হুট করেই ডান পায়ে শুন্যতা অনুভব এবং শরীরের নিয়ন্ত্রন হারিয়ে পড়ে গেলাম ছাদের মেঝেতে। কি হলো কি ব্যাপারটা বুঝে নেবাই আগেই ডান পায়ের নীচে বেশ যন্ত্রনা অনুভূত হলো। ডান পা টাতে তখনো নিয়ন্ত্রন ফিরে আসেনি তাই হাত দিয়েই টেনে নিয়ে দেখি পায়ের তলায় ভেটকি মাছের মেরুদন্ডের তিনটে কশেরুকা একেবারে পুরোটা সেঁধিয়ে গেছে পায়ের তলা দিয়ে। প্রায় মিনিট ঘুরে যাবার পর মুখ দিয়ে বেরুলো — উহ!

ছাদে এতক্ষন যে দর্শকরা আমাদের দাদা-নাতির খেলা উপভোগ করছিলো তার প্রায় সবাইই আমার ভাগ্না-ভাগ্নী নইলে ভাতিজা-ভাতিজী। এর মধ্যে থেকে এক ভাগ্নী একেবারে চিলের মতো ছুটে এসে আমার পা টাকে তুলে ধরলো। তারপর দুমদাম বলা নেই কওয়া নেই দে হ্যাঁচটা টান (কাঁটাটাকে ধরে)। কাঁটা বেরিয়ে আসার বদলে ভেঙ্গে ওঁর হাতে চলে এলো (একটা কশেরুকা পুরোটাই বেরিয়ে এসেছে পুরো সোয়া ইঞ্চি সাইজে, আরেকটা ভেতরেই রয়ে গেছে গোড়া থেকে ভেঙ্গে) এবং ও পুরোই হাতে কাঁটার ভগ্নাংশটুকু ধরে হতভম্ব হয়ে বসে রইলো। এর মধ্যেই নীচ থেকে খবর পেয়ে আপা উপরে উঠে এসেছেন। উঠেই প্রথম দৃশ্য — “আমার পা থেকে রক্ত গলগলিয়ে ঝরছে”। আর যায় কোথা? ছাদ ঝাড়ু দেবার কথা বলেছিলেন সকালে যে কাজের লোকেদের তাঁদের দাবড়ে, বকাঝকা করে একাকার। এরই মধ্যে ঐ ভাগ্নী ধাতস্থ হয়েছে এবং বেশ খানদানী সাইজের একখানা সুঁচ ও শন (চিমটা) জোগাড় করে এনেছে। তারপর তুমুল উৎসাহে চললো আমার পায়ের তলায় অস্ত্রোপাচার। কাঁটার টুকরো ব্যাটা ধবধবে সাদা রং ধারন করে মাংসের সাথে মিশে থাকবার পরেও ভাগ্নীর চোখ তাকে ঠিকই খুঁজে পেলো আর চিমটার শক্ত ও মজবুত টানে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হলো।

মাগার এরই মধ্যে আমার ঠ্যাং আর আমার নেই। ব্যথায় টনটন করছে আর তা মাথার ব্যথাটাকে এমন বাড়িয়ে দিলো যে তা বলে বোঝানোর উপায় থাকলো না। বেলা এগারোটা নাগাদ জীবানুমুক্ত করে ব্যান্ডেজ বেঁধে ছেদে আমাকে নিশ্চিত করলো পাশের বাড়ীতে থাকা ডাক্তার। কিন্তু তাতে কি? ঠ্যাং এর তলা আপাতত ব্যথামুক্ত হলেও মাথার যন্ত্রনায় আমার তো ত্রাহি ত্রাহি দশা। যাই হোক কোনমতে বিকেল অবদি পার করলাম। তারপরেই হলো খেলা শুরু, গায়ে কাঁপুনি দেয়া শুরু হলো সাথে গা গরমের অনুভূতি আর হাতে পায়ে খিঁচ ধরে যাবার মতো অবস্থা। ডাক্তারকে ইমার্জেন্সী কল করা হলো। মাগরিবের নামাজ অবদি দেখলেন ডাক্তার তারপর বললেন — “করার কিচ্ছু নেই, এটিএস একটা ঢুকাতেই হবে।” যাই হোক বারো রুপি দিয়ে এটিএস অ্যাম্পুল কিনে আনা হলো সাথে পাঁচ রুপি মূল্যের ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ। দুই মিনিটে খেল খতম। ডাক্তার বাবু নিমিষেই আমার ডান বাহুতে প্রযুক্ত করে দিলেন আমার জীবনের প্রথম এটিএস (ধনুষ্টংকার প্রতিরোধক টীকা)।

এতক্ষন কাহিনীটা শোনবার পর আপনাদের মনে সেই আবারো সন্দেহ এবং ভুঁরু তিন/চার ভাঁজে কুঞ্চিত করে একটা প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছেন — “এখানে কাক (কাউয়া) এলো কোত্থেকে?”। দুশ্চিন্তার কিচ্ছু নেই উত্তর দেবার জন্য আমি এখনো বহাল তবিয়তেই আছি। তো শুনে নিন। কোলকাতার এই অঞ্চলের কাকেদের একটা বদভ্যাস হলো ও বাড়ীর হাড্ডি/এঁটোকাঁটা তুলে নিয়ে এসে এ বাড়ীর ছাদে ভক্ষন করা। তো সম্ভবত সেই রকমের একটা কাহিনী করেছে কোন কাক ১৪ই ডিসেম্বর সন্ধ্যেতেই (আমি এদিন বিকেলেই কোলকাতায় পৌঁছেছি)। আর ওই কাঁটাটা সেই শ্যাওলার মধ্যেই রয়ে গেছে যেটা ছাদ ঝাড়ু না দেবার কারনে পরিষ্কারভাবে দেখা যায়নি। আর তারপরের ঘটনা যে কি ঘটেছে তা তো দৃশ্য মিলিয়ে কল্পনার ফ্রেমে সাঁটালেই খাপে খাপে মিলে যাবে। তাই না? 😀

Posted in খেয়াল করুন, জেনে রাখুন, দেশ ও জাতির প্রতি দ্বায়বদ্ধতা, প্রযুক্তি নিয়ে আউলা চিন্তা, ভালো লাগা, ভালোবাসা

“বারক্যাম্প”??? !!! বিষয়ডা কি? খায়? মাথায় দেয়? নাকি…


‘ক্যাম্প’ শব্দটা শোনামাত্রই মিনিমাম কান্ডজ্ঞান সম্পন্ন আর সচেতন আম্রজনতার মগজের সিন্যাপসে ক্রমাগত রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার ফলে যে চিত্রখানি ফুটিয়া উঠিবে তাহা হইলো — “একখানি মুক্ত এলাকায় কতকগুলি তাম্বু খাটাইয়া, কতকগুলি মানবছানার, একটানা কয়েকটি দিবা ও রাত্রি অতিবাহিত করন।” তবে আমাদের আজিকার আলোচ্য বিষয়ের শেষে ক্যাম্প থাকিলেও তাহার পূর্বে একখানি অতিরিক্ত শব্দ “বার” যুক্ত হইয়াছে। ইহার প্রতিক্রিয়া হইতে পারে কয়েকরকম। প্রথমত: “ইহা কি এমন একখানি ক্যাম্প যেখানে বার থাকিবে?” মানে হইতেছে যে, “এখানে কি জনগন পর্যাপ্ত পরিমানে অ্যালকোহল যুক্ত পানীয় সেবনের অধিকার পাইবে?” এবং দ্বিতীয়ত: “নাকি ইহা এমন ক্যাম্প যেখানে সারি সারি “বার” আইমিন দন্ড দন্ডায়মান থাকিবে? আর যদি দন্ডের দন্ডায়মান অবস্থাই মুখ্য হয় তো, ক্যাম্পের উদ্দেশ্যখানি কি? কোন বার কখন হেলিয়া, কাইত হইয়া কিংবা শুইয়া পড়িতেছে তাহার অবলোকন কিংবা দৃশ্যধারন করা?” তৃতীয়ত: “নাকি ইহা ১২ জন মানুষের ক্যাম্প?”

যাই হোক অত দুশ্চিন্তা, প্রশ্ন, পাল্টা প্রশ্ন, ব্যাখ্যা, যুক্তি/তর্কে মাথা চুল তুলে ফেলে টাক সৃষ্টি কিংবা সদ্য গজানো টাকখানি চকচকে করে তোলবার সাধ আমার নাই। সোজা মূল বিষয়ে চলে আসি। “বারক্যাম্প” হলো এমন একটা মিলনমেলা যেখানে কিছু সচেতন মানুষ একত্রিত হবেন এবং পূর্বনির্ধারিত কিছু বিষয়ে সরাসরি আলোচনা ও নিজ নিজ মতামত সবাই সবার সাথে ভাগাভাগি করবেন। প্রয়োজনে কিছু লাইভ ডেমো কিংবা তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করবেন এবং এই আয়োজনটা হবে একটানা কমপক্ষে ৪৮ ঘন্টাব্যাপী। ফলাস্বরুপ পূর্বনির্ধারিত বিষয়/বিষয় সমূহে কার্যকরী কিছু পদক্ষেপ, সমাধান, দিক নির্দেশনা বেরিয়ে আসবে খুব সহজ ও সামগ্রিকপন্থায়, যা কিনা সমগ্র বিশ্বের জন্যেই হতে পারে দৃষ্টান্তস্বরুপ।

ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জ্ঞানভান্ডার আন্তর্জালের জগৎ থেকে কুড়িয়ে-কাড়িয়ে যতটুকু জ্ঞানার্জন করেছি, তাতে করে বলতে পারি যে “বারক্যাম্প” প্রথমবারের মতো পৃথিবীর বুকে আয়োজিত হয়েছিলো ক্যালিফোর্নিয়ার পাওলো অল্টো তে, ২০০৫ সালের আগষ্ট মাসের ১৯ থেকে ২১ তারিখ অবদি। আয়োজন স্থল ছিলো Socialtext এর অফিস কক্ষ। মাত্র ১ সপ্তাহের পরিকল্পনায় আয়োজিত এই আয়োজনে অংশ নেন প্রায় ২০০ শতাধিক মানুষ। ২০০৬ সালেই প্রথম বর্ষপূর্তিতে এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় “বারক্যাম্প আর্থ” শিরোনাম নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে, আগষ্ট মাসের ২৫-২৭ তারিখ ব্যাপী। ২০০৭ সালে এসে পুনরায় এই আয়োজন ফিরে আসে এর প্রথম আয়োজন স্থলে। কিন্তু এবার আর সেই ছোট্ট অফিস কক্ষে কুলায়নি। প্রায় তিনটা ব্লক ব্যাসের বৃত্তের আয়তন জুড়ে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে অংশ নেয় ৮০০ র অধিক আগ্রহী। আর আয়োজনটা চলে আগষ্ট মাসেরই ১৮-১৯ তারিখ জুড়ে। ২০১০ সালের জানুয়ারীতে মিয়ানমার(বার্মা) এ অনুষ্টিত “বারক্যাম্প ইয়াংগুন” ছিলো সাড়া জাগানো। প্রায় ২৭০০ (দুই হাজার সাত শত) আগ্রহী রেজিষ্ট্রেশনের মাধ্যমে নিশ্চিত করেন তাঁর অংশগ্রহন। আজ অবদি বিশ্বের প্রায় ৩৫০ টি শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছে এই আয়োজন। সর্বোচ্চ আয়োজনটি ছিলো ২০১১ সালের জানুয়ারী মাসেই, এতে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ৪৭০০ (চার হাজার সাত শত) মানুষ এবং এ আয়োজনটিও মিয়ানমারে আয়োজিত হয়েছিলো।

“বারক্যাম্প’ কেন অনন্য?
# কেননা এই ক্যাম্পে অংশগ্রহনকারী প্রত্যেকেই পূর্বনির্ধারিত বিষয়সমূহ নিয়ে কথা বলতে/চিন্তা-চেতনা/ভাবনা/পরিকল্পনা ভাগাভাগি করতে আগ্রহী।
# তাঁরা একে অন্যের সাথে ব্যক্তিগত পরিচিতিতে বিশ্বাসী না হয়ে একত্রে অবস্থান ও কাজ করতে আগ্রহী।
# টানা ৪৮ ঘন্টা থেকে ৭২ ঘন্টা একটা নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে, কাজ করবার মতো যথেষ্ট ধৈর্য্য ও ক্ষমতা রাখেন অংশগ্রহনকারীরা।
# তথ্যের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে আয়োজন স্থলে অাবশ্যিক উপাদান হিসেবে ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক উপলভ্য হয়ে থাকে।
# এই সম্মেলনে আজ অবদি সামগ্রিক সিদ্ধান্তগ্রহন অতি সহজেই হয়ে এসেছে এবং আগামীতেও সে ধারা বজায় থাকবে বলে আশা করা যায়।

আরো বিস্তারিত জানতে উইকিপিডিয়া’র এই আর্টিকেলটি দেখতে পারেন।

তথ্য ও প্রযুক্তিপ্রেমী কিছু বাংলাদেশী তরুন ও যুবার উদ্যোগে বাংলাদেশে এই আয়োজন প্রথমবারের মতো আগামী ১১ ও ১২ই ডিসেম্বর রবি ও সোমবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ”বারক্যাম্প ২০১১, তথ্যপ্রযুক্তি’র বাংলাদেশ” শিরোনামে, পলাশীতে অবস্থিত ফ্রেপড (FREPD) মিলনায়তনে। সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে রাত ৮টা অবদি দুইদিনব্যাপী আয়োজনে তথ্যপ্রযুক্তি’র বিভিন্ন বিষয় সহ আরো নানান বিষয়েই আলোচনা করা হবে।

আয়োজনটি উন্মুক্ত হলেও অংশগ্রহনকারীদের জন্য আইডি ও বিভিন্ন আয়োজন চুড়ান্ত করতে অগ্রীম নাম নিবন্ধন করা জরুরী। আর তাই আয়োজকদেরকে সহযোগীতা করতে অনুগ্রহ করে এখানে আপনার তথ্য দিন।

আয়োজনটি কোথায় হচ্ছে? কিভাবে পৌঁছুবেন আয়োজন স্থলে? দুশ্চিন্তা না করে প্রথমে ম্যাপ দেখে নিন। তারপরেও মাথায় গিট্টু ছুটলে আমার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করুন। 🙂