Posted in প্রযুক্তি নিয়ে আউলা চিন্তা

হালের ফ্যাশান আর ভবিষ্যৎ বালা-মুসিবত ২য় পর্ব


রবিবার, জুলাই 28 2013 সময় 18:19:20

বাবাঃ মা রে তোর যে বিশাল ক্ষতি হলো তা তো আমি পুষিয়ে দিতে পারবো না। তবে তোর জন্য ছোট্ট দুইটা উপদেশ। রাখবি রে মা?
মেয়েঃ কি বাপ্স?
বাবাঃ প্রথমটা, এই যে জটিল ভাষার ব্যবহার করছিস সেটা বন্ধ কর। হয় পুরো বিদেশি ভাষায় বল না হলে পুরো বাংলায় বল। হয় ‘ড্যাডি’ বল না হলে ‘বাবা’ বল।
মেয়েঃ ইউ আর সো রুড বাপ্স।
বাবাঃ এটা রূঢ়তা না রে মা, ভালোবাসা। দেশের প্রতি, সন্তানের প্রতি, ভাষার প্রতি ভালোবাসা রে মা। তোর মুখে ‘বাবা’ ডাক শুনতেই বেশি ভালো লাগে।
মেয়েঃ আচ্ছা বাপ্স, সরি বাবা। দ্বিতীয় টা বলো।
বাবাঃ তাহলে একটু সময় করে শোন। ‘ইতিহাসের’ থেকে কিছুটা বলবো। বিগত ২০০৪ সালে কিছু আধপাগলা মানুষের নিঃস্বার্থ শ্রম আর নিষ্ঠায় পৃথিবীতে এক যুগান্তকারী অপারেটিং সিস্টমের সূচনা ঘটেছিলো। সেই অপারেটিং সিস্টেমের ব্যবহার এতটাই সহজ আর সাবলীল ছিলো যে, যে কেউ নিজ ভাষায়, নিজের মতো করে সেটাকে ব্যবহার করতে পারতো। সেই অপারেটিং সিস্টেমের গঠনশৈলী এতটা আধুনিক ছিলো যে এটাতে কোন ‘ভাইরাস’ জনিত সমস্যাই ঘটেনি। নিজের ভাষায় ব্যবহার করা যায় বলে এই অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করতো গ্রামের অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন চাষা, মজুর সহ মোটামুটি বাংলা পড়তে লিখতে পারতো যারা তারা সব্বাই। এঁরা প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে আর কতটা আগে চলে এসেছে তা তুই চিন্তাও করতে পারবি না। তবে হ্যাঁ শুরু থেকেই এই অপারেটিং সিস্টেমের পেছনে লেগেছিলো তোর ‘জানালা’ এর প্রস্তুতকারী কোম্পানি আর এর দোসর ওই যে কি ক্যাস্পার না কি বললি ওঁরা। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। কারন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মাপের কম্পিউটার প্রোগ্রামার আর ডেভেলপাররা লেগেছিলেন নিজের নিঃস্বার্থ শ্রম দিয়ে এর উন্নয়নসাধনে। কারন একটাই তোর ওই ‘জানালা’ কোম্পানি সবকিছু যে নিজের কুক্ষিগত করতে চাইছিলো তার তোদের মতো আধুনিক ছেলেপেলেরা না বুঝতে না পারলেও ওই ‘আধ পাগলা’ মানুষগুলো ঠিকই বুঝতে পারছিলো। আর তাই তাঁরা সব সময় স্বাধীন চিন্তা দিয়ে আর অক্লান্ত শ্রম দিয়ে গড়ে তোলে নিজেদের এক অপারেটিং সিস্টেমের যাঁর নাম দেয় তাঁরা ‘উবুন্টু’।
মেয়েঃ ওহ বাপ্স, সরি বাবা। আমি এটা জানতাম। ‘উবুন্টু’ আমার কিছু বন্ধু ব্যবহার করে তো। কিন্তু আমার ভালো লাগে না। মেন্যু সিস্টেম উল্টা। গ্রাফিক্স দেখতে তেমন সুন্দর না আর ভালো কোন গেমস নেই। আর..
বাবাঃ মা রে একটা একটা করে অভিযোগ কর। আমি তোর সব প্রশ্নের উত্তর ই দেবো। একটু ধীরে, আর থেমে থেমে কর। তোরা ‘বুলেট ট্রেন স্পীডের’ প্রশ্নের উত্তর আমার মতো বুড়ো কেউ না হয়ে যদি তোর বয়েসি কেউ হতো তাহলে তুই হয়তো প্রশ্ন করার সুযোগই পেতি না। যাই হোক এবার একটা একটা করে তোর প্রশ্নের উত্তর দেই। মনোযোগ দিয়ে খেয়াল কর।
মেয়েঃ বলো ড্যাড।
বাবাঃ সবার আগে চিন্তায় আন আজকে দুপুরেই তোর যে সমস্যা হলো সেটার কথা। তোর ল্যাপটপ কোন কারন ছাড়াই যে হটাৎ ক্রাশ করে গেলো আর তোর সব অতি প্রয়োজনীয় তথ্য হারিয়ে গেল সেটার কথা। এই সমস্যাটা কখনোই হয়নি ‘লিনাক্স’ কিংবা ‘উবুন্টু’র ইতিহাসে। এর ফাইল সিস্টেম অতি শক্তিশালী। যদি কোন দিন কোন ভাবে সিস্টেম ক্রাশ করেও যায় তবু এর ডাটা লস ঠেকানো যায়। আর ডাটা রিকভারিও করা যায়। এর ফাইলসিস্টেমের ডাটা স্ট্রাকচার এতটাই শক্তিশালী। আর এসব চিন্তা করার আগেও চিন্তা কর তোর ‘জানালা’ সিস্টমে কি তুই তোর ইচ্ছেনুযায়ী সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারতি? নিশ্চয় না। কিন্তু ‘উবুন্ট’ তোকে দেবে সেই স্বাধীনতা। তুই তোর পছন্দের যে কোন সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারিস। এরপর আয় তোর গেমিং প্রশ্নে? তুই যে গেমিং করিস তোরা ল্যাপটপে তার সবই তো চোরাই, ৭০টাকার ডিভিডি তে কেনা। ওই চোরাই পন্য তুই লাইসেন্স করা ‘জানালা’ সিস্টেমে চালাস। এটাও পাইরেসি আইনে দন্ডনীয়। এবার তোকে যদি কেউ বলে ৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে একেকটা গেমস কিনে খেলতে হবে তুই তা মেনে নিয়ে চলতে পারবি? যদি তুই পারতে চাস ও আমার সাধ্যে কুলাবে না রে মা। কেননা আমি মাসের বেতনই পাই ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে তোরা পড়াশুনা আর সংসার খরচ চালাতেই আমি হিমশিম খাই। এর পরে ৫ হাজার টাকা দিয়ে একটা গেমডিভিডি কেনা ‘গরীবের ঘোড়া রোগ’ রে মা। আমি এটা পারবো না। এছাড়া তোর ‘জানালা’ সিস্টেমে যে ফ্রি গেম গুলো খেলতে পারিস সে রকম অনেক গেম আছে ‘উবুন্টু’ তেও। আর অনেক ডেভেলপার অনেক গেমস ফ্রিও দেয় ‘উবুন্টু’তে। এ ব্যাপারে সাহায্য লাগলে তোকে আমি আর তোর ঐ বন্ধুরা সাহায্য করতে পারবে।
মেয়েঃ কিন্তু এটার মেন্যু সিস্টেম তো ‘উল্টো’।
বাবাঃ এটা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার মাত্র। সব কিছুই একইরকম দেখতে হবে এটা কি ঠিক? যেমন মনে কর তুই তোর মতো সুন্দর দেখতে আবার তোর ‘মা’ ছিলেন তাঁর নিজের মতোর সুন্দর। যদি তুই তোর মার মতোন হুবহু দেখতে হতি তবে কতোটা বেমানান লাগতো বুঝিস? আবার মনে কর তোর বয়ফ্রেন্ড যদি তোর মতোই দেখতে হয় তবে কি তুই পছন্দ করবি?
মেয়েঃ বাবা দেখ, তুমি কিন্তু গাব্বুকে নিয়ে কিছু বলবে না। ও একটু মোটা তবে সুইট।
বাবাঃ ঠিক এটাই আমি বলতে চাচ্ছিলাম। প্রত্যেকে নিজের মতোই সুন্দর, শুধু দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য আনতে হবে।
মেয়েঃ আচ্ছা বলো শুনি।
বাবাঃ আমরা অনেকদিন ধরে দেখে আসছি যে জিনিষটাকে একই রকম, তাতে একটু পরিবর্তন আসলে কিন্তু ভালোই লাগার কথা। ঠিক তেমনি ভালো লাগার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই ‘উবুন্টু’ মেন্যু সিস্টেমে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আমরা আজীবন পপ-আপ মেন্যু দেখে এসেছি। এবার আমাদের সামনে এসেছে ড্রপ-ডাউন মেন্যু। ব্যাপারটাকে এভাবে তুলনা করি যে গ্রামের এক লোক শিক্ষিত, পরিশীলিত। প্রতিদিন সে মাটির ঘরে মাদুর বিছিয়ে শোয়। জানালা দিয়ে আসা প্রাকৃতিক বাতাস আর চাঁদের আলোয় ঘুমায় সে। কিন্তু কাজের প্রয়োজন পড়ায় তাকে শহরে আসতে হলো। তাঁর ভালো একটা চাকরী হলো আর তাঁর বাসস্থান ঠিক হলো ১৫তলা দালানে । এখন তাঁকে এখানে বাকিটা জীবন জীবনের তাগিদে এখানেই কাটাতে হবে। এবার যদি সে ১৫ তলা দালানের মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে শুতে চায় তো শুতে পারে কিন্ত একেতো তা বেমানান আর মাটিতে শোবার সেই অনুভূতি সে কোনদিনই পাবেনা। এখন যদি সে প্রতিদিন শহরে এসে চাকরি করে রাত্রে গ্রামে যেয়ে শোবার অনুভূতি নিতে চায় তো সেটা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। আর তোরা ‘বর্তমান ফ্যাশনেবল প্রজন্ম’ সেটাই করছিস।
মেয়েঃ কি রকম?’জানালা’র মতো এত সহজ ইন্টারফেস তো ‘উবুন্টু’র নাই।
বাবাঃ রাত অনেক হতে চললো রে মা। চল রাতের খাবার খেতে বসি। খাবার টেবিলেই না হয় আলোচনা করবো।
মেয়েঃ চলো বাবা। অনেকদিন পর তোমার সাথে বসে খাবো। চলো………

………চলবে

Advertisements

লেখক:

রান্না করা, মোবাইল প্রোগ্রামিং, কম্প্যুটিং, ক্রিকেট

19 thoughts on “হালের ফ্যাশান আর ভবিষ্যৎ বালা-মুসিবত ২য় পর্ব

  1. বস্ মেনু তো ইচ্ছামত পরিবর্তন করা যায় … এইটা নিয়ে প্যাচাপেচির দরকার কী? মিন্টে তো মেনু নিচে, কেডিইতেও নিচে। আমার উবুন্টুতেও আমি নিচে নিয়ে আসি কারণ না হলে দেখা যায় ফায়ারফক্সের মেনু চাপতে গিয়ে সিস্টেম মেনুতে চিপি দিয়ে ফেলসি … .. 😀

  2. আপনি গল্প লিখতেও পারেন দেখছি। দারুণ লিখেছেন। চালিয়ে যান। সামনে বইমেলা আছে। পাতলা ধরণের কোন বইও যদি বের করতে পারেন, তবে হিট হয়ে যাবেন। কথা দিচ্ছি।

    1. ভাই ভয় পাইলাম তো। আমি তো শুধুমাত্র মগজের কুটকুটানি গুলারে একটু বাক্যরূপ দেবার চেষ্টা করি মাত্র। এই নিয়া বই লিখতে চাইলে তো ………….মেসাকার হয়ে যাবে।

    1. লিফোতে দিতে মনে চায় না। আমার এই উল্টাপাল্টা কিছু খোঁচাখুচিঁগুলো আমার ব্লগেই থাক। অবশ্য আপনি চাইলে দিতে পারেন।

  3. লেখাটা দারুন হচ্ছে, তবে ছোট্ট একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে- আচ্ছা এখন তো ইয়ং জেনারেশন বেশি নিলাক্স সম্পর্কে আগ্রহী এবং তারাই বেশি প্রচার করছে, প্রচার করছে। সেই মতে মুরুব্বীরা খুবই কম জানে। এমন অনেকেই আছে- উইন্ডোজ বাদে যে অন্য ও.এস থাকতে পারে তাই জানে না। তাদেরকে জানাচ্ছে নবীনরা। আপনার লেখায় তার উল্টো মনে হচ্ছে……………

লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s