নির্ভীক, দৃঢ় আর স্বাধীন চেতনায় বিশ্বের যে কোন প্রান্তে

পাঁচমিশেলী রং


মাঝে মাঝেই আমার অদ্ভুত সব খেয়াল চেপে বসে। মাথার ভেতরে হুটহাট কি যেনো ঘটে যায়। খুব করে ইচ্ছে করে ছন্দ নিয়ে, শব্দ নিয়ে, কথা নিয়ে খেলতে। আজকেও তেমনটাই ঘটেছে। প্রকাশ আপনাদের সামনেই করলাম। দেখুন কি মানের জগাখিচুড়ী হলো। :D

লাল-নীল কষ্টগুলো সব
ধূলোয় মেশাও একসাথে
এক ফুঁকেতে উড়িয়ে দাও আজ
মিলিয়ে যাক সব জীবন থেকে।

সৃষ্টি আর কৃষ্টি মাঝে
ডুবাও তুমি জীবনটারে
সৃষ্টি মাঝে হারিয়ে গিয়ে
ফের খুঁজে নাও আপনারে।

হেলায় কেন হারাবে তোমার
জীবনের সব রংগুলো
সৃষ্টি দিয়ে দুঃখ ঢাকো
মনটাকে করো সৃষ্টিভুলো।

বোকা থাকো আর
থাকো শিশু
জানাবার খিদেয় জীবন কাটাও
বাড়তে দিয়ো না, জ্ঞান-পশু।

“হায়! আমার মাথার চতুর্দিকে যদি চোখ বসানো থাকত, তাহলে আচক্রবালবিস্তৃত এই সুন্দরী ধরনীর সম্পূর্ণ সৌন্দর্য একসঙ্গেই দেখতে পেতুম” — আনাতোল ফ্রাঁস, ফরাসী ঔপন্যাসিক।

“সংসারে জ্বালা-যন্ত্রনা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে, মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেয়া এবং বিপদকালে তার ভিতরে ডুব দেয়া। যে যত বেশী ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, যন্ত্রনা এড়াবার ক্ষমতা তাঁর ততই বেশী হয়” — বারট্রান্ড রাসেল, ইংরেজ ঔপন্যাসিক।

“মনের চোখ বাড়ানো বা কমানো তো আমার হাতে। নানা জ্ঞানবিজ্ঞান যতই আমি আয়ত্ত করতে থাকি, ততই এক-একটা করে আমার মনের চোখ ফুটতে থাকে। পৃথিবীর আর সব সভ্যজাত যতই চোখের সংখ্যা বাড়াতে ব্যস্ত, আমরা ততই আরব্য উপন্যাসের একচোখা দৈত্যের মতো ঘোঁৎ ঘোঁৎ করি আর চোখ বাড়াবার কথা তুললেই চোখ রাঙ্গাই।” — সৈয়দ মুজতবা আলী, বাঙ্গালি সাহিত্যিক।

সৈয়দ মুজতবা আলী’র রম্যসাহিত্য ‘বই কেনা’ থেকে এই উদ্ধৃতিগুলো দিয়েই আমার আজকের এই লেখার শুরু করছি। আমি নিজে মূলত প্রযুক্তি বিষয়ক সচেনতনার কার্যক্রমে জড়িত থাকি, মুক্তপ্রযুক্তিকে ভালোবাসি, প্রযুক্তিতেই বাঁচি, প্রযুক্তি ব্যবহার করি, প্রযুক্তিতে জগতের মাঝে আটক পড়ে গিয়েছে আমার জীবনের সবটুকু। মুক্তপ্রযুক্তি’র জগতে আমার জ্ঞান-ধারনা-বক্তব্য গুলোকে লিখিত মাধ্যমে ধরে রাখতেই একটা সময়ে ব্লগ লিখতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নিজের মাঝে থাকা কিঞ্চিৎ সাহিত্যপ্রেম আর সাহিত্য বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ফসলে ব্লগে কিছু কিছু লেখা লিখেছি যা আমার ব্যক্তিগত আবেগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তবে এসব কিছুই কিন্তু করা সেই উদ্ধৃতিগুলোর ধারনা থেকে, মানে মনের চোখের সংখ্যা বাড়াতে। অধিকাংশই নিজের জন্য আবার কখনোবা আমার চারপাশের আমজনতার জন্যেও।

সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন —

“মনের চোখ বাড়াবার পন্থাটা কি? প্রথমত – বই পড়া এবং তার জন্য দরকার বই কেনার প্রবৃত্তি।”

মনের চোখ ফোটানোর এই প্রয়োজনটা প্রতিনিয়তই উপলব্ধি করি। আর তাই নিয়মিত বই কিনি, বই ডাউনলোড করি। আর শুধু পড়ি বললে ভুল হবে, গোগ্রাসে বই গিলে থাকি। মাঝে মাঝে কাগজের ঠোঙ্গা, পুরনো খবরের কাগজ, বাচ্চাদের আঁকিবুকি করা কাগজও আমার কাছে প্রচন্ড আগ্রহের পাঠ্য হয়ে ওঠে।

বিগত ২৬শে মে ২০১৪ইং তারিখে জি+ বা গুগল প্লাসে প্রকৌশলী আদনান কাইয়ুম তানিমের পোষ্ট থেকে জানতে পারলাম যে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ২০১৪-২০১৫ শিক্ষাবর্ষের একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেনীর শিক্ষাপোযোগী হিসেবে “তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি” বিষয়ক পাঠ্যবইটি প্রকাশিত হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটি আমার প্রচন্ড আগ্রহের একটি বিষয়। আর তাই মনস্থির করে ফেললাম প্রকৌশলী আদনান কাইয়ুম তানিম কর্তৃক রচিত এই বইটি পড়বো বলে। যথা ভাবনা তথা কাজ। মুঠোফোন প্রযুক্তির সদ্ব্যবহারে বাংলাবাজারে নিজের প্রকাশণা জগতের ভালোবাসা আর আত্মীয়তার সুত্রটাকে খুঁচিয়ে দিলাম, উদ্দেশ্য বইটাকে নিজ হাতে পাওয়া। হাতে পাওয়া মাত্রই বইটা পড়তে শুরু করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বইয়ের বহিঃসজ্জা বা প্রচ্ছদ পরিকল্পনাটা এতটাই সুন্দর হয়েছে যে নজর বেশ কিছুক্ষণ এই বহিঃসজ্জাতেই আটকে ছিলো।

ছোটবেলায় প্রচন্ড বদভ্যাস ছিলো। নতুন বই হাতে পেলেই সেটা পড়ে শেষ না করা অবদি নাওয়া-খাওয়া তো দূর, প্রকৃতির ডাকেও সাড়া দেয়া হতো না। মা জননী আমার পিছনে লেগে লেগে একসময় নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়তেন তবু পড়তে থাকা বইটার শেষ অক্ষরটা না পড়ে আমার কোন নড়নচড়ন হতো না। বইটাকে হাতে পেতেই যেনো আমার সময়কাল হুট করে প্রায় দেড়যুগ পেছনে চলে গেলো। কলেজ জীবনের রঙ্গীন দিনগুলো মনের ভেতরে রঙের ঘূর্নিঝড় তুলে দিলো। স্মৃতিকাতরতাকে পাশ কাটিয়ে একটার পর একটা পাতা উল্টেছি আর বইটির প্রতি চরম আকর্ষন বোধ করেছি। এই মোহবোধটুকু বজায় ছিলো বইয়ের শেষ পাতার শেষ দাড়িটুকু অবদি। প্রচন্ডরকম সুন্দর তথ্য উপস্থাপন, বর্ননার ধারাবাহিকতাটুকু ধরে রাখা আর বর্ননার ফাঁকে ফাঁকে ছবির ব্যবহার বইটাকে অত্যন্ত সহজবোধ্য করেছে। আমার কলেজ জীবনে এমন একটি বইয়ের অভাব এই সময়ে এসে হুট করেই আমাকে প্রচন্ডরকমের কষ্টে ফেলেছে। একই সাথে নতুন দিনের তথ্যপ্রযুক্তি সেনানীদের জীবনগঠনের সময়েই প্রযুক্তিজগতের বর্তমান সময়ের পেক্ষাপটে সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্যসমৃদ্ধ, প্রাঞ্জল আর সহজবোধ্য এমন একটি বইয়ের প্রাপ্তিযোগে প্রচন্ডরকমের আনন্দও পাচ্ছি।

বইটির একেবারে শুরুতেই ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেনীর সকল শাখার জন্য আবশ্যিক বিষয় হিসেবে “তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি” বিষয়ের সিলেবাসটি দেয়া হয়েছে। মোট ১৪০টি ক্লাস পিরিয়ড বা ৪০মিনিট থেকে ৪৫মিনিট ব্যপী একেকটি ক্লাসের মোট ১৪০টিতে এই বইটির তথ্য সম্পূর্ণরূপে শিক্ষার্থীরা আয়ত্ত করতে পারবেন এই বিশ্বাসটুকু বইটির শুরুতে যেভাবে বিবৃত হয়েছে তার ফলে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ পাঠ পরিকল্পনা চমৎকারভাবে করতে পারবেন বলেই বিশ্বাস করি। একই সাথে শিক্ষকদের জন্য তথ্যটা সময়োপযোগী এবং ব্যবহারবান্ধব হয়েছে বলে মনে করছি।

প্রথম অধ্যায়ে আলোচিত বিষয়গুলো তথ্যপ্রযুক্তির প্রাথমিক বিষয় বিধায় শিক্ষার্থীদের জন্য আবশ্যিক ও জরুরী। লেখক নিজের অনলাইন ফোরাম ও ব্লগে ব্যবহারকারীদের সফটওয়্যার ব্যবহার সহযোগীতা দেবার অভিজ্ঞতায় অত্যন্ত সাবলীল ভাষার ব্যবহারে বিষয়গুলোকে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে উপস্থাপন করেছেন। আশা করি পাঠক-শিক্ষার্থীরা তথ্যগুলো জানবার সাথে সাথে বেশ আগ্রহ ও মজা পাবেন আর নিজেদের মগজের স্মৃতিকোষে তথ্যগুলো ধারনে সফল হবেন। এই অধ্যায়ের সবটুকু চমৎকার হলেও শেষাংশে এসে লেখক কিঞ্চিৎ গুবলেট করেছেন বলেই মনে হয়েছে আমার কাছে। হ্যাকিং আর ক্র্যাকিং বিষয় দুটো পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন না করে লেখক নৈতিকভাবে শিক্ষার্থীদেরকে বিভ্রান্তির মধ্যে রাখবার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। একই সাথে ২০১১ইং সাল থেকে উন্মুক্তপ্রযুক্তি অপারেটিং সিস্টেম হিসেব ডেস্কটপে সর্বাধিক জনপ্রিয় ও ব্যবহারবান্ধব “লিনাক্স মিন্ট”, সার্ভার জগতে ডেবিয়ান এবং সর্বোপরি জিএনইউ-লিনাক্স এর উল্লেখ না থাকাটাও অনেকাংশেই উইন্ডোজের উপরে নির্ভরশীল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদেরকে মুক্তপ্রযুক্তির জগতে আসতে বা তাল মিলিয়ে চলতে কিছুটা হলেও বাধা দেবে বলে আশংকা করছি। এই তথ্যবিভ্রাটগুলো একজন উন্মুক্ত প্রযুক্তি আন্দোলনকারী, মুক্ত পেশাজীবি তথ্যপ্রযুক্তি পরামর্শক হিসেবে আমাকে প্রচন্ড আহত করেছে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ের বিষয়বস্তুগুলোও অত্যন্ত সাবলীল ভাষায়, চমৎকারভাবে বর্ননার ফলে শিক্ষার্থীদের মগজের নিউরনে অনুরণন তুলবে বলেই আশা রাখি। তবে তারবিহীন যোগাযোগ প্রযুক্তির অংশ হিসেবে বহুল প্রচলিত ওয়াইফাই প্রযুক্তি’র তথ্যে সাম্প্রতিককালীন ও ব্যবহারিক তথ্যগুলো যুক্ত না থাকায় এই অধ্যায়ের এই অংশটাও তথ্যবিভ্রাটের সৃষ্টি করেছে। একই সাথে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের নেটওয়ার্ক ডিভাইস অংশে প্রাচীন বা বিলীণ হয়ে যাওয়া কিছু যন্ত্রাংশের তথ্য অপ্রয়োজনীয় বা বাহুল্য হিসেবে বোধ হয়েছে আমার কাছে।

তৃতীয় অধ্যায়টা আমার কাছে এই বইয়ের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সবচাইতে কঠিনবোধ্য অধ্যায় বলেই মনে হয়েছে। তবে লেখক নিজের স্বভাবজাত সাবলীল বর্ননায় এই অধ্যায়ের প্রতিটা বিষয়কে এত সুন্দর আর সহজবোধ্য করে তুলেছেন যে লেখার শুরুতে এইরকমের একটা বইয়ের যে অভাববোধের আফসোস আমার মাঝে হয়েছে বলে জানিয়েছিলাম আপনাদেরকে সেটা এইখানেতেই জন্ম নিয়েছে। শুধুমাত্র উচ্চমাধ্যমিক স্তরেই নয় বইটি স্নাতকস্তরের প্রথম সেমিষ্টারের অনেক শিক্ষার্থীদের জন্যেও বিশেষ উপযোগী হবে বলে আমার ধারনা। আমি ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন স্নাতকস্তরের শিক্ষার্থীকে বইয়ের এই অধ্যায়ের বুলিয়ান অ্যালজেব্রা আর গেইট অংশটুকু পড়তে দিয়ে তারপর মন্তব্য করতে বললে তাঁরা নিজেদের শিক্ষকদের ক্লাসে বসে বোঝা জ্ঞানের চাইতে এই বইয়ের বর্ননার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানটাকে বেশ সহজ শিক্ষনীয় ও সহজবোধ্য বলে মতপ্রকাশ করেন।

চতুর্থ অধ্যায়টুকু বর্তমান সময়ে এসে আউটসোর্সিং নেশায় পেয়ে বসা বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও আগামীদিনের তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের জন্যে বিশেষ উপযোগী হয়েছে। শুধুমাত্র এই অধ্যায় থেকে যেটুকু শিখবে একজন শিক্ষার্থী সেটুকুই মুক্তবাজার অর্থনীতির এই বর্তমান সময়ে এসে মুক্ত তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী হিসেবে পথ চলায় তাঁর সহায়ক হতে পারে।

পঞ্চম অধ্যায়ে প্রোগ্রামিং ভাষা সম্পর্কিত আলোচনা আর সাথে কোডব্লকস আইডিইটার পরিচিতি নবীন তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের বেড়ে ওঠায় বিশেষ সহযোগীতা দেবে বলেই বিশ্বাস করি।

ষষ্ঠ অধ্যায়ে আলোচিত ডাটাবেজ বা তথ্যভান্ডার সম্পর্কিত আলোচনাগুলো বেশ সহজবোধ্যই হবে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের একজ শিক্ষার্থীর কাছে। উন্মুক্ত প্রযুক্তিভিত্তিক আর ইউনিকোড সাপোর্টেড লিব্রে অফিস বেজ এর ব্যবহারে শিক্ষার্থীরা পাবেন বাংলাতে তথ্য সংরক্ষণ করার আবেগের প্রতিফলিত আনন্দ। ষষ্ঠ অধ্যায়ের শেষে ক্রিপ্টোগ্রাফি অংশে জিএনইউপিজি নিয়ে কিছু তথ্যযোগ করা গেলে আরো ভালো হতো বলেই বিশ্বাস করি।

চতুর্থ, পঞ্চম আর ষষ্ঠ এই তিনটে অধ্যায় থেকে অর্জিত জ্ঞান অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার্জনকালীন খরচ যোগাতে সহায়ক হতে পারে। শিক্ষার পাশাপাশি অবসর সময়ের মেধাশ্রমের মাধ্যমে বেশ ভালো আয়ের উপকরণ হতে পারে এই জ্ঞান।

বইটির প্রতি অধ্যায়ের শেষে রয়েছে অত্যন্ত চমৎকার কিছু সৃজনশীল প্রশ্ন। এই অংশটায় লেখক বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় রচিত প্রতিটা বইয়ের চাইতে বেশ কিছু বাড়তি কিছু উপাদানের যোগ ঘটিয়েছেন, যেমনঃ মুক্তিযুদ্ধকালীন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য এবং দেশপ্রেমী মানসিকতার বিকাশ। যা শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক উভয়ের জন্যেই সমভাবে ব্যবহারবান্ধব ও সময়োপযোগী হয়েছে বলেই আমি মনে করছি।

সম্পূর্ণ উন্মুক্ত প্রযুক্তি ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম এবং সফটওয়্যারের ব্যবহারে রচিত বাংলা ভাষার এই বইটি উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সরকারী বা বেসরাকারী কলেজগুলোতে পাঠ্য করা হলে শিক্ষার্থীরা সাম্প্রতিককালীন প্রযুক্তিজগতের সাথে সহজেই তাল মিলিয়ে শিক্ষার্জন করতে পারবেন বলে বিশ্বাস করি। একই সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের নেয়া অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রকল্প থেকে সরকারী স্কুল-কলেজগুলোয় দেয়া কম্পিউটারগুলোয় উবুন্টু তথা জিএনইউ/লিনাক্স তথা উন্মুক্ত প্রযুক্তি ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম তথা সফটওয়্যারগুলোর সাথে শিক্ষার্থীরা পরিচিত ও ব্যবহারবান্ধবতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারবেন বলেই মনে করি। কিছু কিছু বানানের ভুল (মুদ্রনজনিতও হতে পারে) আর মোটা হরফের অক্ষরগুলোর ছাপা ঘোলাটে বা জাবড়ে যাওয়ার ত্রুটিটুকু হিসেবের মধ্যে না নিলেও চলে।

পরিশেষে বলতে চাই উপরের লেখাটুকু বইটির একজন পাঠক হিসেবে আমার তাৎক্ষণিক ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া বা মতামত মাত্র। আর তাই লেখার মধ্যে শব্দের প্রয়োগে বা বাক্যগঠনে অনেক সমস্যা থাকতেই পারে। হয়তোবা লেখক, প্রকাশক এটাকে কোনরূপ সমালোচনা বা মূল্যায়ন হিসেবে নিয়ে আহতবোধ করতে পারেন। তেমনটা হয়ে থাকলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমার এই মতপ্রকাশের উদ্দেশ্য লেখকের কাজের মানের মানোন্নয়ন ঘটাতে সহায়তা করা। বিদ্রুপ করা কিংবা উপহাসের মাধ্যমে লেখকের কর্মস্পৃহাকে ধ্বংস করা কিংবা বাধাগ্রস্ত করার কোনরূপ কিছু আমার লেখনীটুকুতে মনে হলে আন্তরিকভাবে আবারো লেখক ও প্রকাশকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি।


অনুকথন: মুক্তপ্রযুক্তির প্রসারে দেশের আনাচে-কানাচে ছোটাছুটি করা, ব্যক্তিজীবনের ব্যস্ততা, শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে জীবনটাকে টেনে নেয়া এসব মিলিয়ে ২০১৩ইং সালে এই লেখাটার পর আর কিছুই লেখা হয়নি আমার ব্লগটায়। আজকের এই বিশেষ দিবসকে উদ্দেশ্য করে মননের ছন্দপ্রেমিক পোকাটা নিউরনে আবারো কুটকুট করে কামড়াতে শুরু করে আর পুটপুট পুটপুট করে কী-বোর্ডের বোতামগুলোর উপর আঙ্গুল চালিয়ে দিয়ে নিচের লেখাটুকু ঝেড়ে দিলাম। :)

মনের টানেতে
কারনে কিবা অকারনে
কাছে টানি তোমায়।
ভুল বুঝে, রাগেতে
ইচ্ছেয় কিবা অনিচ্ছায়
দূরে রাখা বড় দায়।

চোখের পলকে, ঠোঁটের দোলকে
কত না কথার ফুলঝুড়ি
হালকা ছোঁয়াতে, শিহরিত মনেতে
আনন্দের ছড়াছড়ি।

ভালোবাসা দিবসেই শুধু
ভালোবাসি বলি কেন
সারাবেলা সারাক্ষন
অধরারেই ধরি, যেনো।


অনুকথন: মস্তিষ্ক, চোখ, কান সহ শারীরিক বিভিন্ন সমস্যায় বিরাট যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি বিগত দু’মাস যাবৎ। সেই কারনে এটা আমার ২০১৩ইং সালের প্রথম ব্লগ প্রকাশনা। বিগত বছরে (২০১২ইং) এই লেখাটা লিখেছিলাম আজকের এই বিশেষ দিবসকে উদ্দেশ্য করে। দিন দু’য়েক আগে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পথে, ট্রেনে বসে, মননের ছন্দপ্রেমিক পোকাটা নিউরনে আবারো কুটকুট করে কামড়াতে শুরু করে দিলো আর হাতে ধরে থাকা ট্রেনের টিকিটের উপরেই নিচের লেখাটুকু ঝেড়ে দিলাম। :)

ভালোবাসা ভালোবাসা
অজানা অচেনা আশা
পেতে চেয়ে আরাধনা,
সময়ের আনাগোনা।

ভালোবাসা ভালোবাসা
চামে-চিকনে কাছে আসা,
বিভ্রান্তিতে?
সর্বানাশা!

ভালোবাসা ভালোবাসা
যুক্তিতে বিরহ… দূরাশা,
আবেগে ঠাসা,
চিকিমিকি স্বপ্নে ভাসা।

ভালোবাসা ভালোবাসা
পূর্ণতা, আনন্দ, আশা,
ভ্যালেন্টাইন দিবসে তোমাকেই,
একান্তে পাশে পাওয়া।


পর্ব-১ : অতঃপর বারবণিতা

বিগত বছরের এই সময়টাতেই একটা ভয়াবহ ধারাবাহিক লেখার শুরু করেছিলাম। ধারাবাহিকটাতে দেশের প্রযুক্তি জগতের বর্তমান অবস্থা আর আগামীর ভয়াবহতাকে জ্ঞানের দৃষ্টিতে দৃশ্যায়ন করবার একটা ক্ষুদ্র প্রয়াস ছিলো। হয়তোবা আমার লেখার হাত তেমনটা নয় বিধায় আমার বক্তব্যগুলো অনেকেই বুঝে উঠতে পারেননি আবার যাঁরা বুঝেছেন তাঁদের অনেকেই হয়তোবা নিজের মানসিকতার কারনে কিংবা অন্য যে কোন কারনেই হোক এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। কিছু কিছু মানুষ ছিলেন যাঁরা সচেতনভাবেই আমার লেখাটার গূঢ়ার্থ বোঝবার প্রয়াসে আরো বেশী পড়াশুনা করেছেন এবং নিজেরা নিজেদের প্রযুক্তিগত স্বাধীনতাকে সঠিকভাবে নিশ্চিত করতে/বজায় রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন।

পূর্বের ধারাবাহিক লেখাটায় আমি বারংবার মাইক্রোসফট সহ অন্যান্য সফটওয়্যার জায়ান্টদের অনৈতিক আচরনের কথাগুলো তুলে ধরেছিলাম আর এবারকার এই লেখায় সেই আচরনের শিকার বা লক্ষ্যবস্তু হবার নিদারুন কাহিনীগুলো কার্যকারন সহই প্রকাশ করতে চেষ্টা করবো।

দেশের প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের জগৎটায় বিশাল এক সুনামী বয়ে গেলো এইতো মাত্র কিছুদিন আগেই। কিন্তু আসন্ন আগামীতে এই সুনামী থেকে নিজেদেরকে বাঁচাবার জন্যেই “ইচ্ছামাফিক শ্রম বিক্রয়” করবার ফাঁকে ফাঁকে লেখাটা লিখতে হাতের আঙ্গুলগুলো নিষপিষ করছিলো। কিন্তু সময়ই জোটাতে পারছিলাম না। একটা লেখা লিখে ফেলা সহজ কিন্তু তার সাথে উপস্থাপনা, তথ্যের যাচাই-বাছাই, উপযুক্ততা সব মিলিয়ে যে বিশাল হ্যাপা তা সামলে ওঠার মতো সময় কি যে কষ্টকর বিষয় তা আমাদের মতো “চিরায়ত বেকার”রা ভালোই উপলব্ধি করবেন।

যে বিষয়টা নিয়ে লিখবো সেটা শুধুই যে ব্যক্তিগত আবেগ আর প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়েই এমনটা নয়। এঁর সাথে এই দেশ তথা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী প্রায় সকল প্রযুক্তি পন্য/সেবা ব্যবহারকারীর ব্যক্তিতথ্য নিরাপত্তা জড়িয়ে আছে। আমার সামান্য ভুল বক্তব্য তাঁদের কে বিপথে চালিত করলে সে দায়টুকু নেবার মতো ক্ষমতা/সামর্থ্য আমার মতো অধমের নেই। আর সে কারনেই গত তিন রাতে দশটা থেকে তিনটা অবদি একনিষ্ঠতা আর একাগ্রতার সাথে কিছু পড়াশুনা করে জ্ঞানের চোখ দুটোর দৃষ্টিশক্তিকে একটু বেশিই শক্তিশালী করতে হলো।

আজ ১৬ই ডিসেম্বর, ২০১২ইং, মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে আমাদের সবার প্রাণপ্রিয় এই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য্যটা সবার জন্য নিশ্চিত হয়েছিলো। স্বাধীনতার সবটুকু স্বাদ আজ চারটে দশক পেরিয়েও আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য নিশ্চিত করতে পারিনি। অনেকেই অনেকভাবে অনেক যুক্তিতে অনড় থাকলেও আমি আমার নিজেকেই দোষারোপ করতে চাইবো। কারন আমার স্বাধীনতা আমার কাছে। কেউ সেটা এনেও দেবে না আর আমি স্বাধীনতাটুকু অর্জন করে নেবার পর সেটা অন্য আর কেউ রক্ষাও করে দেবে না। সেটা নিশ্চিত করার সম্পূর্ন দ্বায়িত্ব আমার, আমার হাতে/বুদ্ধিতে/শিক্ষায়/মননে/চেতনায়।

বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জালিক (ইন্টারনেট) যোগাযোগ দৈনন্দিন জীবনে প্রবলভাবে বিস্তার লাভ করেছে আর ক্রমাগত সেটার প্রভাব বেড়েই চলেছে আমাদের মতো বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও। মুঠোফোনের জগৎটায় বেশ কিছু উন্নত প্রযুক্তি ছোঁয়া লেগে তা এখন বাংলাদেশে এতটাই মহামারীর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে হয়তোবা কিছু দিন বাদে ফুটপাতের ভিক্ষুক ভিক্ষা করতেও ইয়াহু আইডি খুলবে আর ফেসবুকের ফ্যানপেজ খুলে নিয়ে প্রচারণা চালাবে। আমার আজকের এই লেখার সাথে “বারবণিতা” কিভাবে যায়/যাচ্ছে সেটা নিয়ে হয়তোবা এরই মধ্যে পাঠকের মগজের নিউরনগুলো ক্রমাগত বিভিন্ন হিসেব কষছে। আর যাঁদের এই দশা এখনো শুরু হয়নি তাঁরা সেই দিকেই যাবার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ছোট বেলায় বাবা-মা আমাদের হাত থেকে অনেক সময়ই অনেক খেলনা কেড়ে রেখে দিতেন। সেটা কি আমাদেরকে খেলনা থেকে বিরত রাখতে, নাকি খেলনার অপব্যবহারে আমাদেরকে শারীরিক দূর্ঘটনার কবল থেকে রক্ষা করতে? যদি কোন ছোট বাচ্চা কোন কারনে কোন খেলনা নিয়ে খেলতে গিয়ে আহত হয় আর পরে দেখা যায় যে খেলনাটা আসলেই বাচ্চাটার জন্য বিপদজনক ছিলো তবে তাঁর দায় কার ঘাড়ে গিয়ে পড়ে/চাপে? নিশ্চয়ই ঐ সময়ে উপস্থিত ঐ বাচ্চার মুরুব্বীদের উপরেই এই দায় বর্তায়। আবার ঐ বাচ্চাটাই যদি সঠিকভাবে নিজের কাজগুলো করতে শেখে, জীবন চলার পথে যোগ্যতা অর্জন করে তখন ঐ বাচ্চার সাথে সাথে বাচ্চার বাবা-মা/মুরব্বীজনরা সকলের প্রশংসা পেয়ে থাকেন। জীবনের দৈনন্দিন বিষয়গুলোর সবকিছুই যদি এই এক বাচ্চা কেন্দ্রিকতার মতোন করে ধরে নিই তবে আরো সহজে ব্যাখ্যা করা যাবে কি? এই প্রশ্নগুলো ভেবে দেখবার প্রয়াস পেলেই বোঝা যাবে আজকের এই লেখাটা আমি যে লিখলাম সেটার পেছনে আমার মনের দৃষ্টিটা কি ছিলো আর এঁর ভেতরের প্রকাশটুকু।

আমার আজকের লেখায় প্রযুক্তি জগতে আমার “স্বাধীনতা” কতটুকু, আসুন তা বুঝে নিতে চেষ্টা করি। প্রযুক্তি মানব জীবনকে একদিকে করে তুলছে সহজতর আবার একই সাথে ঐ প্রযুক্তির অনিরাপদ/অনৈিতক/অযাচিত ব্যবহার আমাদের জীবনকে করে তুলছে অসহায়, পাংশুবর্ণ। আমি যদি প্রযুক্তির ব্যবহার জেনে-শুনে-বুঝে না করি তবে যে কোন মূহুর্ত থেকেই আমি হয়ে যেতে পারি প্রযুক্তির খেলার পুতুল। কোন একটা প্রযুক্তির সুবিধা-অসুবিধাগুলো পরিষ্কারভাবে জেনে-বুঝে যথাযথভাবে ব্যবহার না করলে সেটা হয়ে উঠবে আমারই গড়া আমার নিজের ধ্বংসের মূল অস্ত্র। কিভাবে? আসুন একটা ছোট্ট, বাস্তব উদাহরন দিয়েই মিলিয়ে নিই। আমরা কি বিগত সপ্তাহেই অত্যন্ত আশ্চর্য্যের সাথে খেয়াল করিনি যে কিভাবে বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত আলাপচারিতা প্রযুক্তি জগতটায় কিভাবে নোরাংভাবে ব্যবহৃত হলো আর তাঁর পরিনতি কি হলো?

অনেকের কাছেই এই বিষয়টা শুধুই বিব্রতকর। আবার অনেকেই হয়তোবা বলে বসবেন এটা “হ্যাকিং”। অনেকে বলবেন এটা একান্তই ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।

আসুন এবারে একটু কঠিন কঠিন শব্দের প্রয়োগ চাক্ষুস করি। প্রযুক্তি জগতের একেবারে শুরু থেকে নিয়ে বর্তমান অবদি তিনটি ধারার প্রযুক্তি বিদ্যমান। প্রথম সারিতে রয়েছে মুক্তপ্রযুক্তি, দ্বিতীয় আংশিক মুক্তপ্রযুক্তি আর তৃতীয়ত বদ্ধ বা কুক্ষিগত করে রাখা প্রযুক্তি। তৃতীয় ধারার প্রযুক্তিটিই মানুষ/সাধারন প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদেরকে বেশী আকর্ষন করে আর এখানেই চলে আসছে সেই “বারবণিতা” প্রসংঙ্গ। একজন দেহ ব্যবসায়ী কখন তাঁর দেহটাকে ব্যবসায় কাজে লাগান সেই বিষয়ে বিতর্কে না গিয়ে অতি সাধারনত তিনটি কার্যকারন উল্লেখ করা যেতে পারে — ১। একান্তই কোন সঠিক আয়ের রাস্তা না পেয়ে, ২। ধোঁকায় পড়ে, ৩। নিজের ইচ্ছেয়। তিনটা কার্যকারনের যেটাই ঘটুক না কেন উক্ত বারবণিতার শারিরীক ও মানসিক কষ্ট কিন্তু একই থাকে।

মুক্তপ্রযুক্তি ভিত্তিক বা “ফ্রী” বা “মুক্ত” সফটওয়্যার গুলোর ভেতরকার কোড একেবারে নিম্নমানের সফটওয়্যার প্রস্তুতকারক থেকে শুরু করে একেবারে উপরের সারির মানোন্নয়কারীর কড়া নজরদারীতে থাকে বিধায় এগুলো একেবারেই নিরাপদ একটি প্রযুক্তির সফটওয়্যার এবং সম্পূর্নরূপে সাধারন ব্যবহারকারীদের স্বার্থ সংরক্ষন করে থাকে। কোন পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠান যদি এই প্রকল্পকে কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে উদ্যতও হয় তো সেই প্রতিষ্ঠানই বিপদে পড়ে যেতে বাধ্য থাকে কারন এই প্রকল্পগুলোর পেছনের মানুষগুলো আজীবনের জন্যেই উন্মাদ/উন্মাতাল মুক্তিকামী। এঁরা সংগে সংগে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এ পুঁজিবাদের কবল থেকে বেরিয়ে আসে এবং নিজের স্বাধীনতাকে রক্ষা করে চলে।

আংশিক মুক্তপ্রযুক্তি ভিত্তিক সফটওয়্যারগুলো বিশ্বস্ত সুত্রের হয়ে থাকলে সেটা নিরাপদ হতে বাধ্য। কেননা সেটুকু নিশ্চিয়তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ যে কোন মানোন্নয়নকারী/প্রতিষ্ঠান এই জগতটা থেকে ছিটকে যাবে। তাঁর তৈরী করা যে কোন প্রযুক্তিই পরবর্তী সময়ে আর গ্রহনযোগ্যতাই পাবে না। বিশ্বস্ত সুত্র ব্যতীত এই জগতের অন্যান্য যে সকল সফটওয়্যার বদ্ধ বা কুক্ষিগত প্রযুক্তির কাছাকাছি ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি এবং প্রলোভনে সাধারন ব্যবহারকারীদেরকে কাছে টানে।

একেবারে বদ্ধ/কুক্ষিগত প্রযুক্তিগুলোকে আমার ভাষায় আমি “বারবণিতা”। অনেকেই এহেন কথায় মনে চরম আঘাত প্রাপ্ত হতে পারেন কিন্তু মূল ঘটনা আসলেই এক “বারবণিতা”র প্রলোভনে সর্বস্ব খোয়ানো এক সরল মানুষের কাহিনী। “বারবণিতা” যেমন খুব সহজেই সরল মানুষকে আকর্ষন করে, নিজের রূপে মুগ্ধ করে এবং পরবর্তীতে “খদ্দের” এ পরিনত করে এবং আরো পরে নিজ স্বার্থ হাসিল করতে ব্ল্যাকমেইল/খুন/গুম করে ঠিক একই কাজ করার ক্ষমতা রাখে কুক্ষিগত বা বদ্ধ প্রযুক্তির সফটওয়্যারগুলো। এঁদের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের অনৈতিক আচরন করে থাকে মাইক্রোসফট এবং এঁর প্রযুক্তি ব্যবহারেই সফটওয়্যােরর মানোন্নয়নকারী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

আমার আজকের মূল আলোচনা যে সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশের “যুুদ্ধাপরাধের বিচার ট্রাইবুনালের বিচারপতির স্কাইপি ব্যবহারে কথোপকথন ফাঁস” হবার বিষয়ে সেটুুকু আশা করি ইতোমধ্যেই পাঠক বুঝে নিতে পেরেছেন। কিছু সংবাদপত্রে এই বিষয়ে পরবর্তী দিনগুলোতে আলোচনা/সমালোচনা/প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ (লাল, নীল, হলুদ, বাদামী বিভিন্ন টুপি পড়া .. .. ..) পড়লাম, গনমাধ্যমে কিছু সংবাদ প্রতিবেদন আর আমাদের বিশিষ্ট কিছু রাজনীতিবিদের সর্বজান্তা ধরনের মন্তব্যও শুনলাম/দেখলাম আবার কিছু “টকশো” (ঝাল শো দিলেই ভালো হতো) আয়োজনেও বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতাও দেখলাম ও শুনলাম। সব মিলিয়ে সবাই “হ্যাকিং” করার বিষয়টাকেই তুমুল পরিমানে পাদপ্রদীপের আলোয় টানতে চাইলেন।

বিগত দিনেও একটা জাতীয় আয়োজনে আমাদের তথ্য সচিব জনাব এন আই খান মহোদয় বক্তব্য দেবার সময় বলছিলেন — “আশা করি আমাদের মাঝে আজকে এখানে যাঁরা আছেন তাঁরা সবাই ভালো হ্যাকার” (স্যানিটেশন হ্যাকাথন ২০১২ — বাংলাদেশ)। আবার এই বক্তব্যটার সমর্থনে দুইদিন ব্যাপী আয়োজনের পুরোটা সময় আয়োজনের সঞ্চালকদ্বয় নিজেদেরকে বেশ স্মার্ট হিসেবে উপস্থাপন করলেও ঐ আয়োজনে উপস্থিত সব “হ্যাকার”কে আদর করে “কোডার” হিসেবে ডেকেছেন। এই দুই পর্যায়ের মানুষ ছাড়াও যাঁদের মনে আমার এই বাড়তি কথাগুলো বিরক্তিকর মনে হচ্ছে তাঁদের জন্য আরো একটু বিরক্তি অপেক্ষা করছে। “হ্যাকার” == অত্যন্ত দক্ষ ও চিন্তাশীল ব্যক্তি/বর্গ এবং যাঁর নৈতিকতা ও বিবেচনাবোধ তাঁদেরকে সার্বজনীন মঙ্গলমূলক কোন কাজ ছাড়া আর কিছু করতে বাধা দেয়। এর ঠিক বিপরীতার্থক শব্দ হলো “ক্র্যাকার” == হ্যাকারের ন্যায়ই দক্ষ ও চিন্তাশীল ব্যক্তি তবে ইনার নৈতিকতাবোধ ও বিবেচনাবোধটুকু শুধুই ক্ষতিকর কাজের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ, মঙ্গলময় কিছু এঁদের দ্বারা হয় না, শুধুমাত্রই নিজের স্বার্থের জন্য এঁরা নিজের দক্ষতা আর জ্ঞানকে অপব্যবহার করতে থাকেন।

“হ্যাকিং” বিষয়টাকে আমাদের দেশীয় প্রযুক্তিতে যদি ব্যাখ্যা করা হয় তবে উদাহরনটা হবে মোটামুটি এইরকম — আমি ভাত রান্না করতে জানি কিন্তু আপনি গ্যাস নেই, চুলা নেই, ম্যাচ নেই ইত্যাদি ছুতায় আমার বাড়িতে বসে, আমাকেই আমার আহারের জন্য ভাতটুকু রান্না করতে দিতে অনিচ্ছুক/বাধা দিচ্ছেন। এমতাবস্থায় যদি আমি রাইসকুকােরর ব্যবহারে যদি ভাত রান্না করে নিই তবে সেটাই হলো “হ্যাকিং”। আর যদি এই ভাত রান্না করতে গিয়েই যদি আপনার সাথে মারামারি/কাটাকাটি তে জড়িয়ে পড়ি তো সেটা হবে “ক্র্যাকিং”। দুই ক্ষেত্রেই ভাত রান্না করা যাচ্ছে কিন্তু একটাতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বুদ্ধিবৃত্তিক আচরনের জন্য খুশি হচ্ছে আর পরেরটাতে পরিবারের হয়তো কিছু মানুষ পেশী শক্তির প্রয়োগে খুশি হবে কিন্তু অধিকাংশ মানুষই বিরক্ত হবে এবং একই সাথে নিজের জ্ঞান ও শারীরিক সক্ষমতার অপব্যবহার হলো। আশা করি সবাই বুঝতে পারছেন যে, “হ্যাকিং” করাটা সবসময়েই মঙ্গলার্থে ছিলো, আছে এবং আগামীতেও থাকবে। পক্ষান্তরে “ক্র্যাকিং” ক্ষতিকর, ক্ষতি করে গেছে এবং করছে। আর তাই “হ্যাকার”দেরকে “ক্র্যাকার” বলে সম্বোধন করাটা চরম অপমানজনক। আর ওই যে দুই ব্যক্তি হ্যাকাথনে হ্যাকারদেরকে কোডার কোডার বলে ডেকে গলার রগ
ফুলাচ্ছিলেন তাঁদের কেউ একনজনও যদি আমার এই লেখাটা পড়ে থাকেন তো একান্ত অনুরোধ করবো আগামীতে কোন আয়োজনে এভাবে নিজেকে নগ্নভাবে সবার সামনে উপস্থাপন না করতে। কারন “কোডার”রা প্রাথমিক পর্যায়ের কম্পিউটার প্রোগ্রামার। “হ্যাকাথন” এ আপনারা “হ্যাকার”দেরকে ডেকেছেন, “কোডার”দেরকে নয়। আর যদি আপনাদের মনে বদ্ধমূল ধারনা থেকেই থাকে যে ঐ “স্যানিটেশন হ্যাকাথন ২০১২” এ কোন “হ্যাকার” উপস্থিত ছিলেন না তবে অনুগ্রহ করে আয়োজনটা বন্ধ করে দিয়ে আমাদেরকে বললেই হতো, আমরা বেরিয়ে আসতাম আর নিজেদের জ্ঞানটাকে আরো শানদার করতে সচেষ্ট হবার প্রয়াস পেতাম। সচিব মহোদয়ের বক্তব্যের প্রতিবাদ ঐ আয়োনের ঐ মূহুর্তেই আমি করেছিলাম যে কারনে ঐ আয়োজনে প্রথম রাত্রেই সঞ্চালকদের একজন হালকা পঁচানি দেবার প্রয়াসও নিয়েছিলেন। এই রকম আচরন বিগত চৌদ্দ বছর যাবৎই সয়ে আসছি আরো সইবো, তবু সঠিক কথা বলতে পিছুপা হবো না। আজকের এই লেখার পরে যাঁরা আরেকটু “বিলা” হলেন আমার উপরে তাঁদের জন্যে শুভবুদ্ধির উদয়ের শুভকামনাটুকু করা ছাড়া আমার করার আর কিছুই নাই।

আমাদের দেশের গনমাধ্যমের সকল সাংবাদিক ও সম্পাদকগণ এই “অতি ক্ষুদ্র” বিষয়টাতে একটু সচেতন হলে আশা করি আগামীর বাংলাদেশ ডিজিটাল যুগে প্রবেশের সময় তাঁর সঠিক ও সুহৃদ বন্ধুদেরকেই পাশে পাবে।

“হ্যাকার” আর “হ্যাকিং” বিষয়ক জ্ঞান বিতরন শেষে আমি মূল আলোচনা প্রারম্ভেই কিছু হালকা তথ্য উপস্থাপন করে দিচ্ছি। দেখুন তো মস্তিষ্কের নিউরনে কিঞ্চিৎ অনুরনন ঘটে কি না?

@ আগষ্ট ২০০৩ — পি২পি নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনায় উপযোগী স্কাইপি এর প্রথম বেটা সংস্করন উন্মুক্ত করা হয়।

@ সেপ্টেম্বর, ২০০৫ — ই-বে ২.৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয় স্কাইপি কে

@ জুলাই ২০০৮ — অস্ট্রিয়ান সরকারের আন্তরাষ্ট্রীয় মন্ত্রনালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এই আলোচনা সবার সামনে উঠে আসে যে কোন সমস্যার সৃষ্টি করা ব্যতিরেকেই (আলাপচারীতায়রতদের মনে কোনরূপ সন্দেহের উদ্রেক না করেই) স্কাইপি থেকে স্কাইপির আলাপচারিতা স্পষ্টতই শোনা (আড়িপাতা) সম্ভব।

@ ফেব্রুয়ারী ২০০৯ — ইউরোপে বিভিন্ন দেশ স্কাইপির আভ্যন্তরীন নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে সরব হয়ে ওঠে। আর এটাকে স্কাইপি কর্তৃপক্ষ এই বলে ঢেকে দিতে চায় যে সরকারী দপ্তরগুলো তাঁদের সাথে চুক্তির মাধ্যমে নিজ নিজ দেশের ব্যবহারকারীদের তথ্যে আড়িপাততেই পারেন।

@ সেপ্টেম্বর ২০০৯ — ই-বে ঘোষনা দেয় স্কাইপি এর ৬৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দেবার।

@ মে ২০১১ — মাইক্রোসফট কিনে নেয় স্কাইপিকে

@ অক্টোবর ২০১১ — মাইক্রোসফট স্কাইপি ডিভিশন পুরোপুরি স্বত্বঃবুঝে পায় স্কাইপি এর

@ মে ২০১২ — ফ্রান্সের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনের একটি পলিটেকনিকের যৌথ পরিচালনায় অক্টোবর ২০১১ তে পরিচালিত এক গবেষণায় ১০০০০ স্কাইপি ব্যবহারকারীর ২ সপ্তাহ যাবৎ তথ্য পর্যবেক্ষনে দেখা যায় যে স্কাইপির নিরাপত্তা ত্রুটিব্যবহার করে সংগৃহীত তথ্যে ব্যবহারকারীদের ভৌগলিক অবস্থান এবং আইপি ঠিকানা পর্যবেক্ষন করা সম্ভব এবং অতি সুক্ষভাবেও যাচাই করে মোটামুটি সঠিক অবস্থানেই ব্যবহারকারীকে পর্যবেক্ষন করা সম্ভব হচ্ছে। তথ্যটি এই সময়ে এসে তাঁরা পরিপূর্ন যাচাই বাছাই শেষে প্রকাশ করেন।

@ জুলাই ২০১২ — স্কাইপি ব্যবহারকারীদের পাসওয়ার্ড এনক্রিপশন বিনাই সংরক্ষন ও আন্তর্জালের (ইন্টারনেট) জগতে ব্যবহার করা হচ্ছে এই মর্মে অভিযোগ ওঠে আর এই ত্রুটির কারনে বেশ কিছু ব্যবহারকারী তাঁদের নিজেদের হিসাবটি(অ্যাকাউন্ট)র অধিকার হারিয়ে ফেলেন।

@ সেপ্টেবর ২০১২ — পুরো স্কাইপি নেটওয়ার্কে মাইক্রোসফটের করা নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। মাত্র ছয়টি ধাপে একটি নমুনা স্বরূপ হিসাব (অ্যাকাউন্ট) সঞ্চালনার মাধ্যমে একটি কাংখিত ইমেইল আইডিতে বর্তমানে চলমান/সক্রিয় হিসাব বেদখল করে নেয়া সম্ভব। এই ত্রুটিটি ১৪ই নভেম্বর ২০১২ইং অবদি বজায় ছিলো।

এত কিছুর পরেও উপুর্যপুরি স্কাইপির ব্যবহারকারী খুব একটা কমেনি বরংচ বেড়েইছে। কারন এই তথ্যগুলো প্রযুক্তির সাগরে সার্ফিং করে বেড়ানো মানুষগুলো ছাড়া অন্যদের কাছে বিস্বাদময় আর তারউপর ছিলো এই পুরোটা সময় জুড়ে (২০০৯-২০১২) বিভিন্ন রকমের কলরেট অফার আর বিনামূল্যে কল করার সুবিধার ব্যবস্থা। ঐ যে শিরোনামে লিখে রেখেছি — “বারবণিতা”, সেই ক্যারিশমাটা উপভোগ করেছে সবাই এই সময়টাতেই আর এই প্ররোচনা আর প্রতারণাকে সাথী করেই।

উপরোক্ত তথ্যগুলোর উপরে বিশ্লেষণ সহ আরো কিছু বিষয়ে আলোচনা করবো আগামী পর্বে।

# পর্ব-২ : খদ্দের সমাচার — প্রকাশ করবার ইচ্ছে আছে আগামী ২১শে ডিসেম্বর রাতে।


তারিখ: ২৯শে-জুন-২০১২ইং

অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে “উইন্ডোজ” অপারেটিং সিস্টেম কে আমি “খিড়কী” বা “জানালা” নামে ডাকতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। আমার এ লেখায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি লেখাটা পড়ে আহত হোন বা কষ্ট পেয়ে থাকেন তো সেইজন্যে আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। কিন্তু করার ও তো কিছু নেই। আমার লেখায় যদি আমিই শান্তি না পাই তো লিখবো কি করে‍‍? এই কাজটুকু করাই হতো না যদি না “প্রজন্ম ফোরাম” আর “উবুন্টু বাংলাদেশ” এর মেইলিং লিস্টে কিছু মানুষের ভুল ধারনা কে ভেঙ্গে দিতে কিছু কঠিন মন্তব্য না করতাম আর সেখানে আমাদের গৌতম দা আমাকে এই বিষয়ে বিশদভাবে লেখার জন্য উৎসাহ না দিতেন। গৌতম রয় কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার ভেতরের আমি কে টেনে-হেঁচড়ে বের করে নিয়ে আসবার জন্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটি আমি পর্ব আকারে বিগত ২৯শে ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী প্রতিটি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে প্রকাশ করতে চেষ্টা করেছি। শারীরিক অসুস্থতার কারনে মাঝের কিছু পর্বের প্রকাশকাল আমার পক্ষে ঠিক রাখা সম্ভব হয়নি। এজন্যে আমি আমার লেখার সকল পাঠকের কাজে আন্তরিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করছি। আজ প্রকাশিত হলো লেখার অষ্টম ও শেষ পর্ব। পাঠক সমালোচনা এবং মতামতের ভিত্তিতে আমার নিজ বক্তব্যের প্রকাশ নিয়ে এই পর্ব রচিত হলো।

আপনার আগ্রহ থাকলে একটু সময় করে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম [ক] ও সপ্তম [খ] পর্বের লেখাগুলো পড়ে নিতে পারেন।

আমার এই লেখার পূর্বে প্রকাশিত পর্বগুলো –
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ১) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ২৯শে ডিসেম্বর ২০১১ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ২) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ৫ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৩) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ১২ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৪) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ১৯শে জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৫) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ৩১শে জানুয়ারী ২০১২ইং, মঙ্গলবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৬) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ১৬ই ফেব্রুয়ারী ২০১২ইং, শুক্রবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৭[ক]) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ৩১শে মার্চ ২০১২ইং, শনিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৭[খ]) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ১৪ই মে ২০১২ইং, সোমবার রাত্রে।

আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন যে, ফাউন্ডেশন ফর ওপেন সোর্স সলিউশনস বাংলাদেশ (Foundation for Open Source Solutions Bangladesh বা FOSS Bangladesh) বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে মুক্তপ্রযুক্তি’র প্রসার ও প্রচারের লক্ষ্যেই বিভিন্ন ধরনের জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে বিগত ২০১১ইং সালের জানুয়ারী মাস থেকেই। আজ অবদি আমরা দেশের পাঁচটি বিভাগীয় শহর সহ বারোটি জেলা শহরে আমাদের “পেঙ্গুইন মেলা” আয়োজন নিয়ে গিয়েছি আর ছড়িয়ে দিয়েছি সাধারন প্রযুক্তিব্যবহারকারীদের মাঝে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের আলো আর শিক্ষনীয় সচেতনতার বিচ্ছুরনকে। প্রায় দেড় হাজার নতুন কম্পিউটার ব্যবহারকারী আমাদের এই সকল আয়োজনের মাধ্যমে মুক্ত প্রযুক্তি আর মুক্ত সফটওয়্যারের বিষয়ে জানতে পেরেছেন। নতুন এবং পুরানো মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার ব্যবহারকারীকে আমরা দিয়েছি জিএনইউ/লিনাক্স ব্যবহারে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবহার সহায়তা সেবা।

সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ নিজের সামাজিক দায়বদ্ধতা আর কর্তব্যের জায়গা থেকে অনেক কিছুই করে। অত্যন্ত ক্ষুদ্র একজন মানুষ হিসেবে আমার করনীয় কাজের অনেকগুলোই করা হয়ে ওঠে না শারীরিক নানান জটিলতা/প্রতিবন্ধকতার কারনে। আর ২০০৬ইং সালের শুরু থেকে আজ অবদি হয়তোবা খুব বেশী একটা কলম ধরবার সুযোগই পাইনি। তবে যখন যেখানে প্রযুক্তির কলম (কার্সর) ধরেছি প্রযুক্তির জগতে ব্যবহারকারীদের প্রতি বিভিন্ন সময়ে অন্যায়-অবিচার আর অসচেতনতা নিয়ে কথা বলেছি, বলছি আর বলে যাবো ইনশাল্লাহ।

আমি এই লেখাটা লিখতে শুরু করেছিলাম মূলতঃ কোলকাতার মুকুন্দপুরের আরটিআইআইসিএস হাসপাতালের বিছানা থেকে। সারাটা দিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বসে কাটাতে খুব কষ্ট হতো। একই সাথে দেশে থাকাকালীন আমার দুরন্ত জীবনটাকে বড্ড বেশী মনে পড়তো। দেশ – দেশের মানুষের জন্য আমার কিছু করার সামর্থ্য তো খুব সামান্য। তবে প্রযুক্তি জগতে মুনাফালোভীরা আগামী দিনে আমাদেরকে কিভাবে করায়ত্ত আর দখল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তা প্রকাশ করার চেষ্টাটুকু ব্যক্ত করতেই আমার ডাক্তার খুব কম সময়ের জন্য (দৈনিক ১ঘন্টা) নেটবুক অনুমোদন করলেন। ভাগ্নেকে বলে জোগাড় করলাম টাটা ফোটনের মডেম। ব্যস! আমাকে আর পায় কে? আন্তর্জালের জগতে কিছু লেখা লিখে মানুষের জন্য কিছু বিষয় যুক্তি-তথ্য-প্রমাণ সহ তুলে ধরতে চেষ্টাটুকু তো করলাম। দেখা যাক, সময়েই বলে দেবে আমার এই সাবধানবানী কতটুকু কার্যকরী হলো।

আমি খুব ভালো করেই জানি আমি কি লিখেছি এবং লিখছি। প্রতিটা মানুষই নিজের মত প্রকাশ করে এবং সেটাকে ব্যক্তিগত মতামতই বলে। আর আমার এই লেখার আগে আমার প্রযুক্তি জীবনের প্রায় ১৪টা বছর আমি এই ধরনের কাজের সাথেই ব্যয় করে এসেছি, অভিজ্ঞতা নিয়েছি আর প্রতিটা লেখাতেই তথ্য প্রমান সহ লিখছি যেগুলো আমার নিজের মনগড়া কিছু নয়, বাস্তবতা। আজকের দিনে যখন মুক্ত সফটওয়্যারের সার্বিক সাফল্যের মুকুট পরবার সময় প্রায় হয়ে এসেছে তখনই আমি এই আন্দোলনটাকে বেগবান করতে বার্তা ছড়াচ্ছি পুরো বাংলায় (বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ উভয় বাংলাতেই)। আমি সফটওয়্যারের মুক্তি বা মুক্ত সফটওয়্যার নিয়ে কথা বলছি শুধুমাত্র সোর্স ওপেন করবার বিষয়ে নয়।

অনেকের মনেই ভ্রান্ত একটা ধারনা রয়েছে/সৃষ্টি হয়েছে যে, “ওপেন সোর্সড পন্যের মানোন্নয়নকারী (ডেভেলপার)গণ খুব দামী (কস্টলি) বা কোন একটা পর্যায়ে এসে এই সব সফটওয়্যারের মানোন্নয়নে (ডেভেলপমেন্ট)র জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয়িত হয়।” এই ভ্রান্ত ধারনাটুকু ভাঙ্গবার সহজ উপায় হলো সারা বিশ্বের উন্মুক্ত সফটওয়্যার গুলোর দিকে একটু নজর বুলানো। যদি এই উন্মুক্ত সফটওয়্যারের ডেভেলপমেন্ট খুব খরুচেই হতো তবে সারা বিশ্ব এটাকে নিতে এত মাতামাতি করতো না। এমনকি আপনাদের বিখ্যাত মাইক্রোসফটও এটাকে ছুঁয়েও দেখতো না। মাইক্রোসফট নিজের প্রযুক্তি পন্যগুলোয় বর্তমানে ওপেন সোর্স প্রযুক্তির ব্যবহার করছে। আর সেইজন্যে কিছু ওপেন প্রোডাক্টের ডেভেলপমেন্টেও সে নিজেই কিছু অবদানও রাখে। নিজের প্রয়োজনে যেখানে মাইক্রোসফট পয়সাগুনে ডেভেলপার রেখে নতুন করে সবকিছুই তৈরী করাতে পারতো সেখানে সে এই কাজটা কেন করে বলুন দেখি? কারন একটাই যে পয়সা দিতে তাঁকে এমন একটা পুরো পন্য প্রস্তুত করাতে হতো সেই পয়সায় সে শুধু বর্তমান অবস্থা থেকে মানোন্নয়ন করিয়েই নিজের কার্যোদ্ধার করে নিতে পারছে। যদি আপনি নিজে মানোন্নয়ন (ডেভেলপমেন্ট) আর খরচ নিয়ন্ত্রন (কস্ট ম্যানেজমেন্ট) না বুঝেই কোন প্রজেক্ট শুরু করে দেন তবে সেটা মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে বাধ্য। সেজন্যে একটা উন্মুক্ত সফট বা এই প্রযুক্তিকে দুষে লাভ নেই। আরো বেশী জানতে হলে পড়ে নিতে পারেন — http://msdn.microsoft.com/en-us/library/aa338205%28v=office.12%29.aspx, http://www.networkworld.com/community/blog/microsoft-uses-open-source-make-outlook-data-

উন্মুক্ত প্রযুক্তির পন্য “লিনাক্স কার্নেল”কে একটা সময়ে ক্যান্সার বলে আখ্যায়িত করা মাইক্রোসফট ইদানিংকালে নিজের প্রয়োজনেই “লিনাক্স কার্নেল” ব্যবহার করছে নিজের পন্যে আর শুধু তো ব্যবহারই নয় নিজের স্বার্থেই এটার মানোন্নয়নেও অবদান রাখতে শুরু করেছে। আরো বেশী জানতে হলে — http://www.linuxfoundation.org/news-media/announcements/2012/04/linux-foundation-releases-annual-linux-development-report পড়ে নিন।

অনেকেই জানেন না যে তিনি নিজেও আজকাল যে ফোরাম/ব্লগে কথা বলছেন/মত প্রকাশ করছেন, এটার সার্ভার থেকে শুরু করে আপনার পর্যন্ত আসা সার্ভিসের প্রতিটা অংশই কিন্তু মুক্ত সফটওয়্যারের কল্যানেই। আজকে বাংলার ছেলেরা যে আউটসোর্সিং করে দেশের অর্থনীতিতে অবদানের পাশাপাশি নিজের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে সেগুলো যদি উন্মুক্ত সফটওয়্যার না হয়ে প্রথমে কিনে, তারপর জ্ঞানার্জন করে, তারপর কামাই করতে হতো তো পরিস্থিতিটুকু বুঝে দেখেন তো কি হতো?

মজা করে “ঘি’ খাবো কিন্তু ঘোষের গায়ে “ঘি’ এর তৈলাক্তভাব আর গন্ধটুকু লেগে থাকে বলে তাকে ঘৃনা করবো এমন মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।

আবার অনেকের মনেই ভ্রান্ত একটা ধারনা রয়েছে/সৃষ্টি হয়েছে যে, “ওপেন সোর্সড পন্যের ব্যবহারকারীগণ বিশেষ কোন গোত্রের মানুষ। হয় তাঁরা খুব উঁচু স্তরের জ্ঞানী মানুষজন কিংবা অন্য গ্রহের কোন প্রাণী (এলিয়েন)।” অতি সাধারন ও সহজ একটা উদাহরন টানি — আমার এক নাতির বয়েস সাড়ে তিন বছর। ও এই সাম্প্রতিক সময়ে মাত্র ১৫ দিন (আমার এই ধারাবাহিকটির লেখা শুরু করবার পূর্বেই) আমার ল্যাপটপ ব্যবহার করেই কম্পিউটারে মজা পেয়ে গিয়েছে এবং বেশ মজা করেই ও সেটাকে চালনা/নিয়ন্ত্রন করতে পারে। আজ অবদি ওকে কোন ভুল বাটনে ক্লিক করতে আমি দেখিনি। ও এখন নিজে নিজে শিক্ষনীয় কার্টুন গুলো বের করে, গেমস খেলে এবং কাজ শেষ কম্পিউটার বন্ধও করে নিয়মমাফিক। আর এসবই করে ও আমার ল্যাপীর ওএস “লিনাক্স মিন্ট ১০ জুলিয়া” ব্যবহার করেই।

অনেকের আমার লেখায় মন্তব্য করতে চেষ্টা করেছেন যে, “কেন এইভাবে উন্মুক্ত ব্লগে নতুন আসা একটা প্রযুক্তি নিয়ে এত ঝড় তুলছি? কেন এতদিন পরে এসে এই সব কথা লিখছি/বলছি? কে আমাকে বিশেষভাবে ভাড়া করে এনে ব্লগে এইসব লিখতে দিয়েছে? ………..ইত্যাদি” প্রত্যুত্তর আমি করেছি আমার লেখার শুরুতেই। অারো বলবো — “ভাড়া করা মুক্তিযোদ্ধা দেখেছেন কোন দেশে? কিংবা ভাড়া করা ভাষা সৈনিক? যাঁরা কি না অকাতরে নিজের দেশ আর ভাষার জন্য জান কুরবার করতে দ্বিধান্বিত নয়।” জেনে রাখুন — “ভাড়ায় সব পাওয়া গেলেও সচেতন মানুষ পাবেন না।” ভাইরে! আমি নিজে যেহেতু এই প্রযুক্তির ব্যবহারে উপকার পাচ্ছি, দেশের জন্য, আমজনতার জন্য উপকার দেখতে পাচ্ছি তাই এটা নিয়ে বলছি, সাথে আছি এবং থাকবোও ইনশাল্লাহ।

অনেকেই বলতে চেয়েছেন, “আমি যে প্রতিষ্টানে চাকুরী করি সেটার মালিকও নাকি আমি, আবার শ্রমিকের বেতন ভাতা সময়মতো হয় কিনা কিংবা কমবেশী হয় কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। অফিসে নাকি ‘খিড়কী’ ব্যবহার করে, পাইরেটেড সফট ব্যবহার করে আর এই ব্লগে এসে মুক্ত প্রযুক্তি নিয়ে ফড়ফড় করি সেটাও বলতে চেষ্টা করলেন।” এঁদেরকে কিছু বলবার দরকার মনে করি না। কারন এঁরা দুই লাইন বেশী বোঝা পাবলিক। যতটুকু জানেন তার চাইতে বোঝেন বেশী আর মন্তব্য করেন তার চাইতেও বেশী। আরে ভাই যদি এতই মনে খুঁত-খুঁতানি থাকে তো ব্যক্তিগত/রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনুসন্ধান পরিচালনা করে দেখুন আমি ও উন্মুক্ত প্রযুক্তির আন্দেলনে আমার অংশগ্রহণ নিয়ে। দুমদাম মন্তব্য করে নিজেকে বোকার প্রমাণ করবার দরকার কি? এভাবে নিজেই নিজেকেই অপমানিত করবেন না।

অনেকেই আবার “পশ্চিমা গন্ডি ভাঙ্গবার ডাক দিয়েছেন। কেউ কেউ তো আবার অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট নামক আন্দোলনের সাথে উন্মুক্ত প্রযুক্তিকে গুলিয়েও ফেলেছেন।” উন্মুক্ত প্রযুক্তি নতুন কমিউনিজম বা বামপন্থী রাজনীতির কোন ফসল নয়, কিংবা ঐ ধারনাপ্রসুত ও নয়। আমরা সবাই স্কুল জীবনে টিফিন আমাদের বন্ধুদের সাথে ভাগাভাগি (শেয়ার) করতাম। নিজের বই, লেখা এমনকি জামা-জুতো অবদি এই ভালোবাসা প্রকাশ পেতো। আর আজ এসে যদি আমাকে হুট করেই কেউ বলে বসে যে ভাই তোমার কাছে আমি যে সফটওয়্যার বেচেছি তা শুধুই তোমার জন্য তোমার বাবা-মা-ভাই-বোন কারো জন্যেই নয়। আর বন্ধু-বান্ধব সে তো বহুত দূর। বলুন দেখি এটা মানি কিভাবে? আর এই ধারনা ভেঙ্গে দিতেই আমাদের এই উন্মুক্ত প্রযুক্তির আন্দোলন। এটা কোনভাবেই কোনরূপ রাজনীতি নয় বরংচ আমার অধিকার আদায় করে নেবার একটা আন্দোলন। আমরা যেহেতু আমাদের নিজেদের জন্য নিজেদের সফটওয়্যার গুলো তৈরী করে নিচ্ছি, নিতে শিখছি এবং শেখাচ্ছি তাই এমনিতেই এই প্রযুক্তির প্রভাবে আমরা আমাদের সফটওয়্যারের স্বাধীনতা বা মুক্তি নিশ্চিত করতে পারছি। আরো বেশি করে জানতে হলে জেটিএস ম্যুর পরিচালিত “আরওএস” বা “রেভুল্যুশন ওএস” চলচ্চিত্রটি আগ্রহী সবাইকে দেখে-শুনে-বুঝে নেবার আহ্বান জানাবো।

বেশ কিছু মন্তব্য পেয়েছিলাম যে, “আমি নিজে কম্পিউটারে হাতেখড়ি নিয়েছি কি দিয়ে/কোন সফটওয়্যার/ওএস ব্যবহার করে? যদি “খিড়কী” না থাকতো তবে আমি কি করতাম/করেছি? নতুন একটা ওএস তৈরী করে নিয়েছি কি না।” এইরূপ প্রশ্নের উত্তর আমি দিয়েছি বিভিন্ন বাংলা ফোরামে। তদুপরি এই মন্তব্যকারীদেরকে বলতেই হচ্ছে যে, অনুগ্রহ করে “লিনাক্স” কার্নেলের জন্মকথাটা বিভিন্ন বাংলা ব্লগ/ফোরামে পেয়ে যাবেন। একটু দেখে/পড়ে আসুন। আর আমি নিজে কম্পিউটার ব্যবহার করা শিখেছি ১৯৯৭ সাল থেকে আর ১৯৯১ সালেই জন্ম নিয়েছিলো “লিনাক্স কার্নেল”।

কাউকে কাউকে দেখলাম প্রচন্ড মাত্রার উৎসাহী এবং বলতে যে, “সারা বিশ্বে মাইক্রোসফটের পন্য ব্যতীত আর কোন পন্য নাকি কর্পোরেট দুনিয়া-স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহৃত হয়ই না। আর তাই আমার এই মতামতগুলো শুধুই বিরূপ মন্তব্য। পশ্চিমা কর্পোরেট দুনিয়ার দাপটেই নাকি আমাদের এই আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়ছে।” এই উৎসাহী জনতার জন্য ছোট্ট কুইজ — বলুন দেখি লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার বা এলএইচসি প্রকল্পের জন্য ব্যবহৃত ওএস/অপারেটিং সিস্টেম কোনটি/কোন প্রযুক্তির? কিংবা ফ্রান্সের পুলিশ বিভাগ, জার্মান সরকারের দপ্তর আর ভারতের আইন বিভাগের দপ্তরগুলোতে ব্যবহৃত ওএস/অপারেটিং সিস্টেমটা কি/কোন প্রযুক্তির?। বাংলাতেই লেখা একটা ফোরাম টপিকের লিংক দিচ্ছি — http://forum.projanmo.com/topic26412.html আশা করি যে আপনারা সময় করে পড়ে নিবেন। আরো বেশী জানতে হলে ঐ লেখার শেষেই উইকিপিডিয়ার লিংক পেয়ে যাবেন। আশা রাখি যে তাতে আপনাদের ভ্রান্ত কিছু ধারনা পুরোপুরিই ভাঙ্গবে।

অনেকে আমাকে বলতে চেষ্টা করেছেন যে, “আমি নাকি মাইক্রোসফটের প্রতি ঘৃনা থেকে কিংবা হিংসাপ্রসুত হয়ে এই লেখা লিখেছি।” কিন্তু মূলত বিষয়টা হলো আমরা কিভাবে মনোপলি বা একচেটিয়া ব্যবসায়িক মুনাফা লোভীদের বলি হতে চলেছি তা নিয়ে সাধারনকে সচেতন করতে চেষ্টা চালিয়েছি আমার এই লেখায়। এখন যদি তথ্য-প্রমাণের বেশির ভাগই চলে যায় মাইক্রোসফট আর তাঁর পন্যের বিরুদ্ধে তাহলে তাঁকে তো আমি পছন্দ করতে পারি না তাই না? আর যেহেতু এই জগতের সাথে আমার সম্পর্ক প্রায় এক যুগেরও বেশী তাই এই জগতটার নোংরামি আর ভালো দিক দুটোই আমার তুলে ধরা কর্তব্য মনে করেছি এবং এই লেখাটা লিখেছি। মাইক্রোসফটকে সফটওয়্যার জায়ান্ট বলে মুখে ফেণা তুলে ফেললেই হবে না, তাঁর অপকর্মের সমালোচনা/নিন্দা করাটাও তাঁর অন্যায়গুলোকে প্রতিরোধ করবার একটা ভাষা/আন্দোলনের পদক্ষেপ। আর এটুকু করতে গিয়ে যদি “চোর কে চোর বললে যদি চোর/চোরের সাগরেদরা মাইন্ড করে” তাহলে তো সেখানে আমার করার কিছুই নাই। আমি “চোর” কে “চোর”, “ডাকাত” কে “ডাকাত”ই বলবো। আর বলবার সাথে সাথে আমি তো তথ্য-প্রমাণও উপস্থাপন করে দিচ্ছি, পারলে সেগুলো মাইক্রোসফট কিংবা তাঁর সহযোগীগণ খন্ডন করুন।

আপনারা জানেন যে, “এইডস” একটি মহামারী। যা একসময় বানর থেকে ছড়িয়েছিলো মানুষে আর এখন মানুষ জাতিকে নিজের স্বেচ্ছাচারী জীবনযাপনের মাসূল একেবারে সুদে-আসলে দিতে হচ্ছে। সচেতনতা আর নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনই পেরেছে এই মহামারীকে প্রতিহত করতে, মানুষের নিয়ন্ত্রনে আনতে।

ঠিক তেমনি আমার এবং বিশ্বের সচেতন সফটওয়্যার প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ আর তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের নজরে ঐরূপ একটা মহামারী হচ্ছে “মাইক্রোসফট” আর এঁর পন্য। চটকদার পন্য বিপনন ব্যবস্থা আর নতুন নতুন ষড়যন্ত্র আর প্রতারনার ফাঁদসমূহ, যা ধ্বংস করছে জ্ঞানের বিকাশ মাধ্যমগুলোকে। জোরপূর্বক/অবৈধ পন্থায় করায়ত্ত করতে চাইছে আমাদের প্রযুক্তি জীবনের আনন্দ-সুখ-স্বাচ্ছ্যন্দকে। আর তাই আসুন নিজে সচেতন হই, অপরকে সচেতন করি।

সুদীর্ঘ ছয়টি মাস ধরে এই লেখা পড়ে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মন্তব্যের মাধ্যমে আমার লেখাকে এগিয়ে নিতে সহায়তাকারী সকল পাঠক-সমালোচনদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। রিপন মজুমদার ভাইয়ের অনুরোধে এই লেখাটির একটা বুকলেট তৈরী করবো ইনশাল্লাহ আসন্ন ২০১৩ইং সালের ‘অমর একুশে’র বইমেলাতেই। আগামীতে এইরূপ আন্দোলনের সাথে যেনো নিজেকে সর্বক্ষন জড়িয়ে রাখতে পারি আর তথ্য-উপস্থাপনার মাধ্যমে দেশের জনগনের জন্য নিজের সীমিত সামর্থ্যের ব্যবহার করে কিছু করতে পারি সে দোয়াই চাইছি আপনাদের সকলের কাছ থেকে।

আজকে এই পর্বটি প্রকাশ করার মাধ্যমে আমি এই ধারাবাহিকের ইতি টানছি এবং একই সাথে সবাইকে নিজ নিজ ব্লগে এবং ওয়েব সাইটে আমার এই লেখাটি অন্য সবার সাথে ভাগ করে নেবার অনুমতি দিচ্ছি (পাবলিক ফোরামগুলোয় লেখাটা শেয়ার করবার পূর্বে সতর্ক থাকুন, ব্যক্তিগত আক্রমনের শিকার হতে পারেন)। তবে শর্ত হলো মূল লেখা এবং লেখক সত্ত্বঃটুকু হুবহু বজায় রেখে পুরো লেখাটুকু (প্রথম থেকে অষ্টম পর্ব অবদি পর্বাকারে না হয়ে বরংচ একত্রিতকরণপূর্বক একক লেখা হিসেবে)ই প্রকাশ করতে হবে এবং তা আমার এই ব্লগের ন্যায় ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের নন কমার্শিয়াল-শেয়ার অ্যালাইক ধারা-উপধারার অধীনেই প্রকাশ করতে হবে। কোন কিছু বুঝতে অসুবিধা হলে সরাসরি আমার সাথে মুঠোফোন এবং ইমেইলে যোগাযোগে দ্বিধা করবেন না যেনো।


তারিখ: ১৪ই-মে-২০১২ইং

অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে “উইন্ডোজ” অপারেটিং সিস্টেম কে আমি “খিড়কী” বা “জানালা” নামে ডাকতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। আমার এ লেখায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি লেখাটা পড়ে আহত হোন বা কষ্ট পেয়ে থাকেন তো সেইজন্যে আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। কিন্তু করার ও তো কিছু নেই। আমার লেখায় যদি আমিই শান্তি না পাই তো লিখবো কি করে‍‍? এই কাজটুকু করাই হতো না যদি না “প্রজন্ম ফোরাম” আর “উবুন্টু বাংলাদেশ” এর মেইলিং লিস্টে কিছু মানুষের ভুল ধারনা কে ভেঙ্গে দিতে কিছু কঠিন মন্তব্য না করতাম আর সেখানে আমাদের গৌতম দা আমাকে এই বিষয়ে বিশদভাবে লেখার জন্য উৎসাহ না দিতেন। গৌতম রয় কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার ভেতরের আমি কে টেনে-হেঁচড়ে বের করে নিয়ে আসবার জন্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ এই লেখাটি আমি পর্ব আকারে বিগত ২৯শে ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী প্রতিটি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে প্রকাশ করে আসছিলাম। হৃদযন্ত্রে গোলোযোগ আর মস্তিষ্কের জমাট বেঁধে থাকা রক্তের কারনে শারীরিকভাবে কিছুটা দূর্বল থাকায় কিছু পঞ্চম পর্ব থেকেই পূর্বের স্বনির্ধারিত সূচী অনুযায়ী লেখাগুলো প্রকাশ করতে পারিনি। কারন আমার “ময়ূরপঙ্খী নাও” আমাকে যে নির্দিষ্ট ঘাটে নোঙ্গর করতেই দিচ্ছে না। আর তাই এই দীর্ঘ সময় আপনাদেরকে অপেক্ষায় রেখে দেবার জন্যে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। সপ্তম পর্বের লেখাটির দ্বিতীয় খন্ড (৭[খ]) আজ প্রকাশ করতে পারলাম। অষ্টম পর্বেই এই ধারাবাহিক লেখাটির সমাপ্তি টানবো ইনশাল্লাহ। আপনার আগ্রহ থাকলে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম[ক] পর্বের লেখাগুলো একটু সময় করে পড়ে নিতে পারেন।

আজকের লেখায় আমি, মাইক্রোসফট কর্তৃক ৭। ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার প্রতি হুমকি (Threatening user security)নিয়ে যথা সম্ভব সহজ এবং বোধগম্য ভাষায় কিছু বিষয় সকল প্রযুক্তিপ্রেমিক আর প্রযুক্তি পন্য ব্যবহারকারীদের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করছি। আশা রাখি আজকের এ পর্বের লেখার মাধ্যমে কিছু বিষয়ে আপনাদের মনে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারবো এবং আগামীদিনে প্রযুক্তি জীবনের পথ চলায় এটা আপনার পাথেয় হবে।

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৭[ক]) এর শেষাংশেঃ
……………….
আর চরম মজার কাহিনী হলো এই যে এই খিড়কী গুলোর প্রতিটিতেই ফাইল সিস্টেমের সাপোর্ট আপগ্রেড হয়ে এসেছে কিন্তু পূর্ববর্তী ফাইলসিস্টেমটিতেই নতুন সিস্টেমটি ব্যবহারের কোন ব্যবস্থাই ফলপ্রসুভাবে কার্যকরী ছিলো না। ফলে ব্যবহারকারীকে নিজ গুরুত্বপূর্ন তথ্য/নথিপত্রের ক্ষতির সাথে সাথে অনেক তথ্য/নথিপত্র হারাতেও হয়েছে। মাইক্রোসফটের এন্ড ইউজার লাইসেন্স এগ্রিমেন্ট বা EULA তে মাইক্রোসফট আপনাকে কি সুবিধা দিচ্ছে বা নিরাপত্তা দিচ্ছে সেক্ষেত্রে একটু মনোযোগ দিলেই দেখতে পাবেন ফ্রী ওয়্যার বা বিনামূল্যে যে সফটগুলো পাওয়া যায় (উন্মুক্ত বা মুক্ত নয় কেননা সোর্স কোড সহ অন্যান্য শর্ত গুলো পূরন করে না এগুলো) সেগুলোর মতোই মোটামুটি ভাষার ব্যবহার করেছে মাইক্রোসফট। অর্থাৎ আপনাকে নিজ দ্বায়িত্বেই এই ওএসগুলো ব্যবহার করতে হবে কোন রূপ তথ্য হারানো কিংবা বিকৃতির জন্য মাইক্রোসফটকে আপনি কোনমতেই দায়ী করতে পারবেন না।

এবার নিশ্চয়ই আর ছেলেখেলা বা নিছক আনন্দচ্ছলে নিচ্ছেন না বিষয়গুলো কে। নিশ্চয়ই বোধের মূলে খটাখট আঘাত হানছে চিন্তা বা বিবেকবোধের কুড়াল? আশা করি কিছুটা হলেও বুঝতে পারছেন যে ব্যবহারকারীর তথ্যের নিরাপত্তায় হুমকি স্বরূপ কেন মাইক্রোসফটের নামটাকে এত বেশী উচ্চারন করে যাচ্ছি।
……………….

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৭[খ]) র শুরু করছি মাইক্রোসফটেরই নতুন আসা একটি মোবাইল ফোন যার হার্ডওয়্যার ডিজাইন করেছে নোকিয়া। মজার বিষয় হলো এই মুঠোফোনের ওএস বা অপারেটিং সিস্টেম থেকে শুরু করে সব হার্ডওয়্যারই কুক্ষিগত করা রয়েছে। ফলাফল স্বরূপ যেখানে অ্যান্ড্রয়েড চালিত মুঠোফোন বা ট্যাবলেট পিসিগুলোকে ব্যবহারকারী কিংবা ডেভেলপারগণ অতি সহজেই ত্রুটি সংশোধন বা সমস্যা সমাধান করে নিতে/দিতে পারছেন সেই তুলনায় ঐ ফোনের/ফোন সফটওয়্যারের ত্রুটিগুলো সারিয়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের প্রতিই মুখাপেক্ষী থাকতে হচ্ছে। একটু চিন্তা করে দেখলে দেখা যাবে যে এটা আসলে বাধ্যগত করা হচ্ছে। এটা কি সাধারন ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবহার এবং প্রযুক্তি পন্য ব্যবহারের নিরাপত্তায় বিরাট এক হুমকি নয়? অ্যাপলের আইফোন, আইপড, আইপ্যাড সহ অন্যান্য পন্যগুলোও একই দোষে দুষ্ট।

তথ্য প্রযুক্তি পন্য সহ বিভিন্ন সেবামূলক সফটওয়্যার যেমন: স্কাইপি কেও মাইক্রোসফট বর্তমানে সাধারন কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করছে। যদিও বা স্কাইপির উন্মুক্ত সংস্করনের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে ওটা কিভাবে কাজ করে এবং কখন কোথা থেকে, কি মাধ্যমে কি কি তথ্য সংগ্রহ এবং আদান-প্রদান করছে। কিন্তু মাইক্রোসফট স্কাইপি কে কিনে নেবার পর এটা পুরোপুরি ক্লোজড সোর্স একটি সফটওয়্যার এবং সাধারন তথ্যপ্রযুক্তি পন্য ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার প্রতি হুমকি।

এগুলো ছাড়াও মাইক্রোসফটে বিভিন্ন উপায়ে একজন সাধারন ব্যবহারকারীকে তথ্য নিরাপত্তায় হুমকি দিয়ে থাকে। কিভাবে? তা বুঝতে হলে আপনার পুরোনো কোন পিসি যেমন ধরুন (পি৩ ১গি:হার্জ প্রসেসর আর ৫১২ মেগাবাইট মেমরী যুক্ত কোন মেশিনে) উইন্ডোজের বর্তমান কোন সংস্করন চালাবার জন্য চেষ্টা করে দেখুন তো কি ঘটে। অথবা আপনি মাইক্রোসফটের কাছ থেকেই আপনার লাইসেন্সকৃত একটি “উইন্ডোজ এক্সপি”র সাপোর্ট চেয়ে দেখুন। দেখা যাবে যে এই দুই ক্ষেত্রেই আপনি ব্যর্থ হবেন। কেননা পুরোনো মেশিনে নতুন সফটওয়্যারগুলো চালাবার ব্যবস্থা মাইক্রোসফট রাখে না আর পুরোনো সফটওয়্যারের সাপোর্ট সে খুবই দ্রুত বন্ধ করে দেয়। ফলাফল এই যে আপনি না চাইলেও আপনাকে বাধ্য করা হয় নতুন নতুন হার্ডওয়্যার কিনতে আবার পরমূর্হুতেই নতুন সংস্করনের সফটওয়্যারগুলো কেনবার পরেও আপনি নিরাপদ নন কেননা কোন তথ্য নিরাপত্তা তো সে দেবেই না (৭(ক) পর্বে লাইসেন্সিং দ্রষ্টব্য) আবার এই লাইসেন্সের মেয়াদকালও আপনার জন্য দীর্ঘমেয়াদী (নূন্যতম কুড়ি থেকে ত্রিশ বছর) কিছু নয়। কিছু দিনের মধ্যেই আপনাকে নতুন সফটওয়্যার পন্য এবং লাইসেন্স কিনতেই হবে। কেননা নতুন আসা সংস্করনটি পুরোনো সংস্করন থেকে আপগ্রেড করতে দেয়া হয় না, বাধ্যতামূলকভাবে নতুন পন্য হিসেবেই কিনে নিতে হয়।

শুধুতো লাইসেন্স, একই সাথে মাইক্রোসফট নতুন সফটওয়্যারে তৈরীকৃত নথিপত্র পুরনো সফটওয়্যারের মধ্যে নিয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী করার ব্যবস্থাও করে থাকে। এর অর্থ এই যে আপনি হয়তোবা দেখে থাকবেন যে মাইক্রোসফটের অফিসের বর্তমান সংস্করন একই প্যাকেজের পুরোনো সংস্করনের সাথে সমন্বিত নয়। ফলে একই নথি যেটা আপনি বর্তমান সংস্করনে ঠিকঠাক পড়তে এবং সম্পাদনা করতে পারছেন ঠিক একই সফটওয়্যার পুরোনোটাতে হয়তোবা পড়াই যাচ্ছে না, কিংবা পড়া গেলেও ফরম্যাটিং এলোমেলো হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে এই কাজের মাধ্যমে মাইক্রোসফট শুধুমাত্র একজন সাধারন ব্যবহারকারীর প্রতিই যে চাপের সৃষ্টি করছে তাই নয় বরংচ ঐ ব্যবহারকারীর সমগ্র পরিমন্ডলে পরিচিতজনদের উপরেও চাপের সৃষ্টি করছে নতুন পন্যটি কেনাবার লক্ষ্যে। একই সাথে নতুন সফটওয়্যারের ব্যবহার করতে গেলে প্রয়োজন পড়বে নতুন নতুন হার্ডওয়্যার আর সেগুলো কিনতে গিয়ে ব্যয়িত হবে প্রচুর অর্থ। একই সাথে ঐ পুরোনো হার্ডওয়্যারগুলো ব্যবহার উপযোগী থাকা স্বত্ত্বেও আর ব্যবহার করা হবে না ফলে ঘটবে অপচয় আর অপব্যবহার। আর যদি এগুলো পুরোপুরি বাতিল বলে ফেলে রাখা হয় তো সেটাও ঘটবে অত্যন্ত অবহেলায় আর অযত্নে ফলে ঘটবে পরিবেশ দূষণ। ফলে সামগ্রিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে এ বিশ্ব আর বিশ্ববাসী সবাই। আর এভাবেই সাধারন ব্যবহারকারীদের পছন্দের সফটওয়্যারটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নূন্যতম অধিকারটুকু সম্পূর্নই লংঘিত ও ব্যবসায়িক কু-চক্রের থাবায় ক্ষনেক্ষনে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে।

আপনার কি মনে হয়? এগুলো কি কোনরূপেই হুমকি নয়? আমার সামান্য জ্ঞানে, একজন অতি সাধারন কম্পিউটার ব্যবহারকারী হিসেবে আমাকে, আমার অধিকারকে মাইক্রোসফট এবং ঐরূপ কু-চক্রী কর্তৃক জব্দ বা শায়েস্তা করবার একটা প্রক্রিয়া হিসেবেই এ পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করে থাকি।

এই সপ্তম পর্বের লেখাটুকুকে আরো সহজবোধ্য করতে একটা ছোট্ট গল্প বলা জরুরী বলে মনে হচ্ছে। তবে শুনুন — আমাদের শিশুদেরকে আমরা যখন প্রথম প্রথম সামাজিক মূল্যবোধ গুলো শিক্ষা দিতে শুরু করি তখন কোন জিনিষটা বেশী করে বোঝাই? “Sharing বা ভাগাভাগি করে নেয়া”র অভ্যাসটুকু — তাই না? আমাদের ছোটবেলাতেও আমাদের গুরুজন/শিক্ষকগণ এটাই শেখাতেন। পাঠশালাতে আমাদের বাসা থেকে মায়ের দেয়া নাস্তা/খাবারটুকু টিফিনের সময় অতি প্রিয় বন্ধুটির সাথে ভাগ করে নেবার মজাই ছিলো আলাদা। আর এতে করে যে উপকার পাওয়া যেতো তা ছিলো একে অপরের সাথে মানসিক বোধের উন্নতি যা কিনা পাঠশালার গন্ডি পেরিয়ে চলে আসতো বাস্তব জীবনের কঠিন পথচলাতেও। একবার ভাবুন তো নিজের নাস্তাটুকু ভাগ করে নেবার বিনিময়ে যে ক্ষুদ্র অংশ আমাদের হারাতে হতো তাঁর চাইতে প্রাপ্তিটুকু কি বিশাল ছিলো !!! কিন্তু প্রোপ্রাইটরি বা মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো আজ আমাদের বাচ্চাদেরকে শেখাতে বাধ্য করছে যে – “না! তোমার কোন কিছুই তুমি ব্যতীত আর কারো সাথেই ভাগযোগ্য নয়।” এটা কি অমানবিক নয়? মানবাধিকারের লংঘন নয়? যদিও বা আমার, আপনার শিশুটি মনে প্রাণে চাইছে যে সে যা কিছু আনন্দময় তা অপরের সাথে ভাগ করে নিতে। আর এটা তো নিশ্চয়ই জানা আছে যে আনন্দ যত জনের সাথে শেয়ার করবেন তা বাড়তেই থাকবে। উন্মুক্ত সফটওয়্যারগুলো আপনার জন্য করে দেয় সেই সুযোগ যা কিনা আপনার অধিকারও বটে। আর তাইতো এই বিষয়ে এত বেশী চিল্লাহল্লা করছি।

আসন্ন অষ্টম পর্বেই আমার এই ধারাবাহিকের সমাপ্তি টানবো। এতগুলো দিন ধরে এই লেখাগুলোর মাধ্যমে যদি আপনাদের মনের মূল্যবোধের দেয়ালে সামান্য আঁচড়টুকুও কাটতে পেরে থাকি তো এই লেখাগুলো স্বার্থক। আমার মতো মূর্খের সাধ্য কতটুকু আর যে দেশের প্রতি দায়বোধটুকু থেকে দেশকে এগিয়ে নেবো? আপনারাই পারেন নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজ নিজ অধিকারটুকু আদায়ের মাধ্যমে, সচেতনা সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের প্রানপ্রিয় এই বাংলাদেশকে আগামীর পথে সফলভাবে এগিয়ে নিতে।

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ১) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ২৯শে ডিসেম্বর ২০১১ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ২) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ৫ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৩) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ১২ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৪) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ১৯শে জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৫) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ৩১শে জানুয়ারী ২০১২ইং, মঙ্গলবার রাত্রে।
বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ৬) প্রকাশিত হয়েছিলো বিগত ১৬ই ফেব্রুয়ারী ২০১২ইং, শুক্রবার রাত্রে।

Tag Cloud

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 123 other followers